খুব সাধারণ জীবন থেকে উঠে এসে আমেরিকান সংগীতের কিংবদন্তি হয়ে ওঠা ডলি পার্টন আর নেই। মার্কিন কান্ট্রি সংগীতের এই রানি মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশভিলে ৮০ বছর বয়সে মারা গেছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘনিষ্ঠ স্বজনদের উপস্থিতিতে ছোট পরিসরে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। দীর্ঘদিন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের পর তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখপাত্র মার্সেল পারিসো।

অর্ধশতকেরও বেশি সময়ের সংগীতজীবনে ডলি পার্টন আমেরিকান মানুষের প্রেম, বিচ্ছেদ, সংগ্রাম ও জীবনের নানা গল্পকে গানে তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন তিন হাজারের বেশি গান, প্রকাশ করেছেন ৪৯টি অ্যালবাম এবং জিতেছেন ১১টি গ্র্যামি পুরস্কার। ‘জোলিন’, ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’, ‘কোট অব মেনি কালারস’ ও ‘নাইন টু ফাইভ’-এর মতো গান তাকে সংগীতের ইতিহাসে স্থায়ী জায়গা করে দিয়েছে।

ডলি পার্টন নিজেকে সবার আগে একজন গীতিকার হিসেবেই ভাবতেন। তার লেখা ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’ প্রথমে কোনো চলচ্চিত্রের জন্য নয়, বরং তার সংগীতসঙ্গী পোর্টার ওয়াগনারকে উদ্দেশ্য করে লেখা হয়েছিল। ওয়াগনারের অনুষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করার পর একক ক্যারিয়ারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে পার্টন গানটি লিখে তাকে শোনান। গানটি শুনে ওয়াগনার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত তার সিদ্ধান্ত মেনে নেন।

পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে ‘দ্য বডিগার্ড’ চলচ্চিত্রে হুইটনি হিউস্টনের কণ্ঠে গানটি নতুন করে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পায়। এর মাধ্যমে ডলি পার্টন বিপুল রয়্যালটি আয় করেন। এর বহু বছর আগে ১৯৭৪ সালে এলভিস প্রিসলি গানটি রেকর্ড করতে চাইলেও তার ম্যানেজমেন্ট গানের স্বত্বের অর্ধেক দাবি করেছিল। পার্টন সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। গানের স্বত্ব ধরে রাখার সেই সিদ্ধান্তই পরবর্তীতে তার অন্যতম বড় আর্থিক সাফল্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

১৯৪৬ সালের ১৯ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসির একটি এক কামরার ঘরে ডলি পার্টনের জন্ম। ১২ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। পরিবারটি ছিল অত্যন্ত দরিদ্র। তার বাবা পড়তে জানতেন না, তবে মায়ের পরিবারের মধ্যে সংগীতের চর্চা ছিল। ছোটবেলায় এক চাচার কাছ থেকে গিটার উপহার পেয়ে মাত্র সাত বছর বয়সেই বাজানো শেখেন এবং গান লেখা শুরু করেন।

হাইস্কুল শেষ করার পর সংগীতকে পেশা হিসেবে নিতে ন্যাশভিলে চলে যান তিনি। সেখানেই পরিচয় হয় কার্ল ডিনের সঙ্গে। পরের বছর তাদের বিয়ে হয়। ১৯৬৫ সালে মনুমেন্ট রেকর্ডসের সঙ্গে চুক্তি করেন পার্টন। দুই বছর পর ‘দ্য পোর্টার ওয়াগনার শো’-এর মাধ্যমে ঘরে ঘরে পরিচিতি পান। ১৯৭১ সালে ‘জশুয়া’ গান দিয়ে প্রথমবার চার্টের শীর্ষে ওঠেন।

সংগীতের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও নিজের অবস্থান তৈরি করেন ডলি পার্টন। ১৯৮০ সালে জেন ফন্ডা ও লিলি টমলিনের সঙ্গে ‘নাইন টু ফাইভ’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তার। সিনেমাটির জন্য লেখা ‘নাইন টু ফাইভ’ গানটি পরে নারীর অধিকার ও কর্মক্ষেত্রে সমতার আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে। এরপর ‘দ্য বেস্ট লিটল হোরহাউস ইন টেক্সাস’ ও ‘স্টিল ম্যাগনোলিয়াস’-এর মতো সফল সিনেমায় অভিনয় করেন তিনি। ২০০৫ সালের ‘ট্রান্সআমেরিকা’ চলচ্চিত্রের ‘ট্রাভেলিন থ্রু’ গানের জন্য অস্কার মনোনয়নও পান।

মানবিক কাজেও ডলি পার্টনের অবদান ছিল অসাধারণ। তার প্রতিষ্ঠিত ‘ইমাজিনেশন লাইব্রেরি’ বিশ্বের শিশুদের জন্য বিনামূল্যে ৩০ কোটির বেশি বই বিতরণ করেছে। নিজের বাবার পড়াশোনা না করতে পারার অভিজ্ঞতা থেকেই এই উদ্যোগের অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন তিনি।

টেনেসির পিজন ফোর্জে তার প্রতিষ্ঠিত থিম পার্ক ‘ডলিউড’ পরবর্তীতে ওই অঞ্চলের অন্যতম বড় কর্মসংস্থানের উৎস হয়ে ওঠে। পাশাপাশি ডলিউড ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের স্কুলে ধরে রাখা এবং উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করতে উৎসাহ দেওয়ার উদ্যোগও নেন তিনি। করোনাভাইরাস মহামারির সময় মডার্নার টিকা গবেষণায় ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়কে ১০ লাখ ডলার অনুদান দিয়েছিলেন পার্টন।

সংগীত, চলচ্চিত্র ও সমাজসেবার বাইরে লেখালেখিতেও সাফল্য পেয়েছেন তিনি। নিজের জীবন নিয়ে একাধিক স্মৃতিকথা লেখার পাশাপাশি জেমস প্যাটারসনের সঙ্গে যৌথভাবে ‘রান রোজ রান’ উপন্যাসও লিখেছেন। শিশুদের জন্যও লিখেছেন বেশ কয়েকটি বই।

১৯৯৯ সালে কান্ট্রি মিউজিক হল অব ফেমে জায়গা পান ডলি পার্টন। ২০১১ সালে রেকর্ডিং একাডেমির লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ডে সম্মানিত হন তিনি।

ব্যক্তিগত জীবন বরাবরই আড়ালে রেখেছিলেন ডলি পার্টন। প্রায় ছয় দশকের দাম্পত্যজীবনে স্বামী কার্ল ডিন কখনোই আলোচনার কেন্দ্রে আসতে চাননি। ২০২৫ সালের মার্চে ৮২ বছর বয়সে ডিনের মৃত্যু পার্টনের জীবনে গভীর শূন্যতা তৈরি করেছিল। তার স্মৃতিতে ‘ইফ ইউ হ্যাডনট বিন দেয়ার’ গানটি প্রকাশ করেন তিনি।

ডলি পার্টনের জীবন ছিল দারিদ্র্য থেকে উঠে এসে প্রতিভা, পরিশ্রম, দূরদর্শিতা ও মানবিকতার মাধ্যমে বিশ্বজয়ের এক অনন্য গল্প। তার গান যেমন প্রজন্মের পর প্রজন্মের শ্রোতার হৃদয়ে বেঁচে থাকবে, তেমনি সংগীতের বাইরে মানুষের জন্য করা তার কাজও তাকে স্মরণীয় করে রাখবে।