একসময় বই পড়ার ছবিটা ছিল খুবই চেনা, সোফায় হেলান দিয়ে কিংবা বাসের জানালায় মুখ রেখে হাতে ধরা একটা আস্ত বই। পাতা ওল্টানোর শব্দ আর তাজা ছাপা কাগজের গন্ধেই মেতে থাকত বইপ্রেমীদের মন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে প্রযুক্তির হাওয়া, আর সেই হাওয়ায় এখন ভর করছে ‘বুকস্ট্রিমিং’। অডিওবই ও ডিজিটালি বই শোনার এই নতুন মাধ্যম পাঠকের পড়ার অভ্যাসে আনছে এক নীরব বিপ্লব।

গান শোনার জন্য আমরা এখন সিডি কিনি না, সিনেমা দেখার জন্য ভি
সিআরও বিলুপ্ত নেটফ্লিক্স বা স্পটিফাইয়ের যুগে মানুষ যেমন কনটেন্ট ‘স্ট্রিম’ করতে অভ্যস্থ হয়ে উঠেছে, বইয়ের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটছে। পকেটে থাকা স্মার্টফোন আর কানে একটা হেডফোন- ব্যাস, এটুকুই যথেষ্ট। যানজটে আটকে থাকা বিরক্তিকর মুহূর্ত, জিম করার সময়, কিংবা রাতে ঘুমানোর আগের সময়টুকুতে এখন বই পড়ার কাজ সেরে নিচ্ছেন তরুণ প্রজন্মের বড় একটা অংশ। আর এই ধারণাকেই সহজ করে তুলেছে বুকস্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো।


বিশ্বজুড়ে অডিবল বা স্টোরিটেলের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো অডিওবুকের বাজার আগেই দখল করেছিল। তবে পিছিয়ে নেই বাংলাদেশ ও ভারতে পশ্চিমবঙ্গও। বাংলা সাহিত্যকে ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে বুকমেট, কাব্যিকসহ একাধিক স্বতন্ত্র প্ল্যাটফর্ম কিংবা ইউটিউব ও বিভিন্ন অ্যাপভিত্তিক অডিওবুক প্ল্যাটফর্মগুলো এখন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র বা সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী রচনা থেকে শুরু করে আজকের তরুণ লেখকের নতুন থ্রিলার-সবই এখন মিলছে অডিও ফর্মেটে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, পেশাদার বাচিকশিল্পী ও আবহসংগীতের পরিমিত ব্যবহারে প্রতিটি গল্প যেন শ্রোতার চোখের সামনে এক দৃশ্যমান জগৎ তৈরি করে।

বিশ্বজুড়ে বুকস্ট্রিমিংকে পাঠকপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দেওয়ার নেপথ্যে রয়েছে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম, যা পড়ার পুরো ধারণাটিকেই বদলে দিয়েছে। এই বিশ্বব্যাপী জোয়ারের মূল কাণ্ডারি অ্যামাজনের ‘অডিবল’। লক্ষাধিক অডিওবই ও বিখ্যাত সব সেলিব্রিটিদের কণ্ঠে এক্সক্লুসিভ ‘অডিবল অরিজিনালস’-এর বিশাল ভাণ্ডার নিয়ে তারা বছরের পর বছর এই শিল্পে রাজত্ব করছে। অন্যদিকে, ইউরোপের জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম ‘স্টোরিটেল’ স্থানীয় ভাষার সাহিত্য ও বহুভাষিক বিষয়বস্তুকে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে উপস্থাপন করে অডিওবুককে বিশ্বজুড়ে সর্বজনীন করে তুলেছে। বই ও অডিওবুকের ডিজিটাল ফ্ল্যাটফর্ম হিসেবে ‘এভার‍্যান্ড’ (পূর্বে স্ক্রিবড হিসেবে পরিচিত) নির্দিষ্ট সাবস্ক্রিপশনে আনলিমিটেড কনটেন্টের স্বাদ দিয়ে বিশ্বজুড়ে তরুণ প্রজন্মের কাছে দারুণ গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। তবে এই ধারায় সবচেয়ে বড় চমক এনেছে গানের বিশ্বখ্যাত স্ট্রিমিং সেবা ‘স্পটিফাই’; তারা তাদের প্ল্যাটফর্মে বিশাল অডিওবুক ক্যাটালগ যুক্ত করায় মানুষ এখন গান ও পডকাস্টের পাশাপাশি একই জায়গায় বই শোনার অভ্যাস গড়ে তুলছে। আন্তর্জাতিক এই মাধ্যমগুলোর কল্যাণে সাহিত্য আজ সীমানার প্রাচীর টপকে রূপ নিয়েছে এক বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা।

বুকস্ট্রিমিংয়ের এই জোয়ার কিন্তু প্রথাগত বই পড়া বন্ধ করে দিচ্ছে না, বরং পড়া বা সাহিত্যচর্চাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করছে। যারা ব্যস্ততার কারণে সময় পেতেন না, অথবা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতার কারণে বই পড়তে পারতেন না, তাদের কাছে সাহিত্যের দুয়ার নতুন করে খুলে গেছে। তা ছাড়া, নতুন প্রজন্মের পাঠক- যারা স্ক্রিনটাইম কমাতে চান অথচ সাহিত্যের স্বাদও পেতে চান, তাদের জন্য অডিওবুক হয়ে উঠেছে এক দারুণ বিকল্প।

অবশ্য বইপ্রেমীদের একটা অংশ এখনও বলেন, কাগজের বই ছুঁয়ে দেখার যে অনুভূতি, তা ডিজিটাল ফর্মেটে মেলে না। অডিওবুক নাকি বইয়ের সঙ্গে পাঠকের সেই আত্মিক যোগাযোগ কিছুটা কমায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রযুক্তির এই যুগে মাধ্যম বদলালেও সাহিত্যের মূল আত্মা একই থাকে। বুকস্ট্রিমিং বইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং বইকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক শক্তিশালী বাহন।

আজকের ব্যস্ত জীবনে সময় যখন বড্ড মেপে চলতে হয়, তখন বুকস্ট্রিমিং এনে দিয়েছে এক টুকরো স্বস্তি। পকেটের ভেতর শত শত বই নিয়ে ঘুরে বেড়ানো আর যেকোনো মুহূর্তে একটা গল্পের মধ্যে ডুবে যাওয়া- সাহিত্যের এই রূপান্তর নিশ্চয়ই মন্দ নয়। কাগজের গন্ধ আর হেডফোনের সুর পাশাপাশি চলুক, সাহিত্যের জয়যাত্রা থমকে না যাক।