এডিফায়ার: চীনের ছোট স্পিকার ব্র্যান্ড থেকে বৈশ্বিক অডিও সাম্রাজ্যে
উন্নতমানের অডিও পণ্যের বাজারে চীনের ব্র্যান্ডগুলোর উত্থান এখন আর নতুন কোনো গল্প নয়। তবে তিন দশক ধরে একটি নিজস্ব ব্র্যান্ড পরিচয় ধরে রেখে বিশ্ববাজারে ক্রমাগত বিস্তৃত হওয়া প্রতিষ্ঠান এখনও খুব বেশি নেই। সেই তালিকায় উল্লেখযোগ্য একটি নাম এডিফায়ার। ১৯৯৬ সালে চীনের বেইজিংয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে স্পিকার নির্মাতা হিসেবে পরিচিতি পেলেও সময়ের সঙ্গে হেডফোন, ওয়্যারলেস ইয়ারবাড, গেমিং অডিও এবং উচ্চমানের ব্যক্তিগত অডিও পণ্যের বিস্তৃত পরিসর তৈরি করেছে। চলতি বছরে এডিফায়ার ৩০ বছর পূর্তি পালন করেছে। চলুন দেখে নেয়া যাক কেমন ছিলো এই দীর্ঘ পথযাত্রা।
সংগীতপ্রেমীদের হাত থেকে বিশ্ববাজারে
এডিফায়ারের যাত্রা শুরু হয়েছিল একদল সংগীতপ্রেমীর হাত ধরে। শুরুতে প্রতিষ্ঠানটির মূল মনোযোগ ছিল কম্পিউটার ও ডেস্কটপের জন্য স্পিকার তৈরি করা। ধীরে ধীরে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে পণ্য রপ্তানি শুরু করে এডিফায়ার। আর এভাবেই চীনের স্থানীয় একটি অডিও ব্র্যান্ড আন্তর্জাতিক পরিচিতি পেতে থাকে।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কর্মীসংখ্যা ৪ হাজারের বেশি এবং বিশ্বের ৭০টিরও বেশি দেশে তাদের পণ্য পাওয়া যায়। উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে সরাসরি কার্যক্রমও রয়েছে।

চীনের দক্ষিণাঞ্চলের দোংগুয়ানে তৈরি হয়েছে এডিফায়ারের বড় উৎপাদন ও গবেষণা অবকাঠামো। সেখানে একই কমপ্লেক্সে রয়েছে গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগ, সাউন্ডপ্রুফ ল্যাব, কাঠের ক্যাবিনেট তৈরির বিভাগ, প্রিন্টিং সুবিধা এবং বিভিন্ন ধরনের মান নিয়ন্ত্রণ ও পরীক্ষার ব্যবস্থা। উৎপাদন ব্যবস্থার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির দিকেও নজর দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। কমপ্লেক্সে সৌরশক্তি, তাপ পুনরুদ্ধার, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ এবং বর্জ্যপানি পরিশোধনের মতো ব্যবস্থা রয়েছে।
ডেস্কটপ স্পিকার থেকে হাই-ফাই
এডিফায়ারের প্রথম দিকের সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আর১০০০টি এবং আর১২৮০ সিরিজের মতো ডেস্কটপ স্পিকার। তুলনামূলক সহজলভ্য দামে ভালোমানের শব্দ দেওয়ার মাধ্যমে এসব পণ্য ব্র্যান্ডটির ভিত্তি শক্ত করে।
পরবর্তী সময়ে এডিফায়ার প্রবেশ করে আরও উচ্চমানের হাই-ফাই অডিওতে। এ ক্ষেত্রে এয়ারপালস সিরিজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০০৪ সাল থেকে বিখ্যাত স্পিকার ডিজাইনার ফিল জোন্সের সঙ্গে সহযোগিতায় এডিফায়ার উন্নত ড্রাইভার ও রিবন টুইটার প্রযুক্তি ব্যবহার করে উচ্চমানের স্পিকার তৈরি করতে থাকে।
এডিফায়ারের পণ্যে নকশা ও প্রকৌশলের এই সমন্বয় পরবর্তী সময়েও দেখা গেছে। উন্নত ডিজিটাল সিগন্যাল প্রসেসিং, বিশেষায়িত ড্রাইভার এবং সূক্ষ্ম অ্যাকোস্টিক টিউনিংয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি শুধু সাশ্রয়ী অডিও পণ্যের ব্র্যান্ড হিসেবে নয়, বরং উচ্চমানের অডিও নির্মাতা হিসেবেও নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে।

ওয়্যারলেস অডিওতে বড় পরিবর্তন
স্মার্টফোন ও তারবিহীন (ওয়্যারলেস) প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে অডিও বাজারের পরিবর্তন খুব দ্রুত বুঝতে পেরেছিল এডিফায়ার। প্রতিষ্ঠানটি আগেই বিভিন্ন ওয়্যারলেস অডিও প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করে। বর্তমানে ব্লুটুথ ও ওয়াই-ফাইভিত্তিক সংযোগের পাশাপাশি কোয়ালকম, টেক্সাস ইনস্ট্রুমেন্টস, এক্সএমওএস, বিএস এবং অ্যাইরোহার মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে এডিফায়ার।
কোয়ালকমের স্ন্যাপড্রাগন সাউন্ড, অ্যাপল এয়ারপ্লে এবং মিরাকাস্টের মতো প্রযুক্তির সমর্থনও রয়েছে এডিফায়ারের বিভিন্ন পণ্যে। ফলে একটি স্পিকার ব্র্যান্ড থেকে ধীরে ধীরে তারা এমন একটি অডিও ইকোসিস্টেম তৈরি করেছে, যেখানে ঘরের বিনোদন, ডেস্কটপ, গেমিং এবং ব্যক্তিগত শোনার অভিজ্ঞতা- সবই জায়গা পেয়েছে।
ইয়ারবাডেও প্রযুক্তির ছাপ
এডিফায়ারের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি এসেছে ট্রু ওয়্যারলেস ইয়ারবাডের বাজারে। ২০২৩ সালে নোবেলসের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি নিওবাডস প্রো ২ মডেলে ব্যালান্সড আর্মেচার ড্রাইভার, মেমস মাইক্রোফোন এবং উন্নত মাল্টিচ্যানেল সক্রিয় শব্দ নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।
এই মডেল উচ্চ রেজ্যুলিউশনের অডিও সমর্থন করে এবং এলএইচডিসি প্রযুক্তির মাধ্যমে উচ্চমানের ওয়্যারলেস অডিও পরিবেশনের সুযোগ দেয়। অর্থাৎ এডিফায়ারের লক্ষ্য কেবল তারবিহীন ইয়ারবাড তৈরি করা নয়; বরং ছোট আকারের পণ্যের মধ্যেও উন্নত অ্যাকোস্টিক প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া।

স্ট্যাক্স অধিগ্রহণ
এডিফায়ারের বৈশ্বিক যাত্রায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল জাপানের বিখ্যাত অডিও ব্র্যান্ড স্ট্যাক্স অধিগ্রহণ। ২০১২ সালে এই অধিগ্রহণের মাধ্যমে এডিফায়ার উচ্চমানের হেডফোন ও প্ল্যানার প্রযুক্তির জগতে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করার সুযোগ পায়। পরবর্তী সময়ে অডেজে বিনিয়োগ এবং গেমিং অডিওর জন্য হেকেট ব্র্যান্ড গড়ে তোলাও প্রতিষ্ঠানটির বিস্তারের অংশ হয়ে ওঠে।
স্ট্যাক্সের প্রযুক্তিগত ঐতিহ্যকে আধুনিক পণ্যে ব্যবহার করে এডিফায়ার স্ট্যাক্স স্পিরিট সিরিজও তৈরি করেছে। এর মধ্যে স্পিরিট এস১০ তারহীন ইয়ারবাডে প্ল্যানার ম্যাগনেটিক ড্রাইভার ও সক্রিয় শব্দ নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তির সমন্বয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
গবেষণায় বড় বিনিয়োগ
এডিফায়ারের সাফল্যের পেছনে শুধু উৎপাদন সক্ষমতা নয়, গবেষণা ও উন্নয়নেও বড় বিনিয়োগ রয়েছে। বেইজিং, গুয়াংজু ও দোংগুয়ানে প্রতিষ্ঠানটির তিনটি গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র রয়েছে। সেখানে স্পিকার ও হেডফোনের শব্দ পরিমাপ, ড্রাইভার পরীক্ষা এবং অ্যাকোস্টিক নকশা নিয়ে কাজ করা হয়।
দোংগুয়ানের গবেষণা কেন্দ্রে রয়েছে অ্যানোকোয়িক চেম্বার এবং ক্লিপেলভিত্তিক স্পিকার পরিমাপের সুবিধা। এর মাধ্যমে পণ্যের নকশা থেকে শুরু করে ড্রাইভার ও শব্দের মান- সবকিছু নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরীক্ষা করা সম্ভব হয়।

নকশাতেও ভিন্ন পরিচয়
অডিও পণ্যের ক্ষেত্রে শব্দের পাশাপাশি নকশাকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করে এডিফায়ার। এর বিভিন্ন স্পিকারে কাঠ, ধাতু ও আধুনিক শিল্পনকশার সমন্বয় দেখা যায়। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির ইএস সিরিজেও হাতে তৈরি কাঠের কাঠামো, চামড়ার মতো উপাদান এবং আধুনিক নিয়ন্ত্রণ প্যানেলের সমন্বয় দেখা গেছে।
নকশার স্বীকৃতিও পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। রেড ডট, আইএফ এবং সিইএস ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ডের মতো আন্তর্জাতিক পুরস্কার এডিফায়ারের পণ্য নকশার তালিকায় রয়েছে।

৩০ বছর পর কোথায় এডিফায়ার?
২০২৬ সালে ৩০ বছর পূর্ণ করা এডিফায়ার এখন আর শুধু কম্পিউটার স্পিকারের ব্র্যান্ড নয়। ঘরের বিনোদনের স্পিকার থেকে শুরু করে ডেস্কটপ অডিও, গেমিং হেডসেট, সক্রিয় শব্দ নিয়ন্ত্রণযুক্ত হেডফোন, তারহীন ইয়ারবাড এবং উচ্চমানের প্ল্যানার ম্যাগনেটিক অডিও- প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজেদের উপস্থিতি তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
সাম্প্রতিক সময়ে টেলিভিশন, গেমিং কনসোল ও স্ট্রিমিং ডিভাইসের সঙ্গে সহজ সংযোগের জন্য বিভিন্ন স্পিকারে এইচডিএমআই ইএআরসি যুক্ত করছে এডিফায়ার। নতুন এম৯০ মডেলে ইউএসবি-সি, এইচডিএমআই ইএআরসি এবং ব্লুটুথ ৬.০-এর মতো আধুনিক সংযোগ সুবিধাও রয়েছে।
চীনের একটি ছোট স্পিকার নির্মাতা থেকে আন্তর্জাতিক অডিও ব্র্যান্ড হয়ে ওঠার গল্পটি তাই শুধু এডিফায়ারের ব্যবসায়িক সাফল্যের গল্প নয়। এটি দেখায়, দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, নিজস্ব প্রযুক্তি, নকশা এবং বৈশ্বিক বাজারকে লক্ষ্য করে এগোতে পারলে চীনের একটি অডিও প্রতিষ্ঠান কীভাবে নিজের ব্র্যান্ড পরিচয় তৈরি করতে পারে। তিন দশক পর এডিফায়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত এটিই- ‘মেড ইন চায়না’ পরিচয়ের বাইরে গিয়ে বিশ্ব অডিও বাজারে নিজের নাম প্রতিষ্ঠা করা।
কোথায় পাবেন?
বাংলাদেশের বাজারে আপনার পাশে রয়েছে ক্রিয়েটিভ ও অডিও পণ্যের নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান মাল্টিমিডিয়া কিংডম। বাংলাদেশের বাজারে আমরা শুধু একটি দোকান নই, ২৬ বছরের একটি ট্রাস্টেড প্রতিষ্ঠান। আমরা বিশ্বাস করি, একটি প্রিমিয়াম প্রযুক্তিপণ্য কেনা বড় একটি বিনিয়োগ। তাই মাল্টিমিডিয়া কিংডমে আমরা কেবল পণ্য বিক্রির চেয়ে আগ্রহী ক্রেতাদের সুপরামর্শ দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আপনার কাজের ধরন অনুযায়ী কোন পণ্যটি সেরা হবে, তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগলে সরাসরি আমাদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এর সঙ্গে (
01755532345
)
পরামর্শ করার সুযোগ রয়েছে। কেনার আগে আপনার প্রয়োজন বুঝে সঠিক পণ্যটি বেছে নিতে আমরা আপনাকে একজন বিশেষজ্ঞের মতোই গাইড করব।