ছবি সম্পাদনা, ভিডিও তৈরি কিংবা গ্রাফিকসের কাজ- যাঁরা এসব সৃজনশীল পেশায় যুক্ত, তাঁদের দিনের বড় একটা সময় কাটে কিবোর্ড আর মাউসের ওপর নির্ভর করে। কখনো ব্রাশের আকার ছোট–বড় করা, কখনো রঙের উজ্জ্বলতা কমানো, আবার কখনো ভিডিওর টাইমলাইনে সামনে-পেছনে যাওয়া- একই কাজ করতে হয় বারবার। এই একঘেয়েমি কাজের গতি যেমন কমিয়ে দেয়, তেমনি নষ্ট করে মনোযোগ। দীর্ঘ সময় কাজ করা মানুষদের এই ক্লান্তি দূর করতে এবং কাজের অভিজ্ঞতাকে আরও স্বচ্ছন্দ করতে নজর কেড়েছে নতুন প্রজন্মের কন্ট্রোলার ‘ট্যুরবক্স’ (TourBox)।

ট্যুরবক্স কোম্পানি সম্পর্কে
ট্যুরবক্স কন্ট্রোলারের নেপথ্যের প্রতিষ্ঠানটির নাম ‘ট্যুরবক্স টেক ইনকরপোরেটেড’। ২০১৬ সালের নভেম্বরে ক্যালিফোর্নিয়াতে এই প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। এর পেছনের গল্পটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। একদল হার্ডওয়্যার প্রকৌশলী, গ্রাফিক নকশাবিদ ও ডিজিটাল ক্রিয়েটর- যাঁরা নিজেরাই প্রচলিত কিবোর্ড ও মাউস দিয়ে দীর্ঘ সময় কাজ করতে গিয়ে ক্লান্ত বোধ করতেন, মূলত তাঁরাই মিলে এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

তাঁদের লক্ষ্য ছিল একটাই- এমন একটি যন্ত্র তৈরি করা, যা মানুষের হাতের স্বাভাবিক নড়াচড়ার সঙ্গে ডিজিটাল সফটওয়্যারের সেতুবন্ধ তৈরি করবে। ক্রাউডফান্ডিং প্ল্যাটফর্ম ‘কিকস্টার্টার’-এ অভাবনীয় সাফল্যের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি তাদের প্রথম পণ্য বাজারে আনে। এরপর আর তাদের পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ব্যবহারকারীদের মতামতের ভিত্তিতে তারা প্রতিনিয়ত নিজেদের পণ্যের উন্নয়ন করে যাচ্ছে।



ট্যুরবক্সের জনপ্রিয় সংস্করণগুলো
যাত্রা শুরুর পর থেকে ট্যুরবক্স টেক বেশ কয়েকটি মডেল বাজারে এনেছে, যা পেশাদার থেকে শুরু করে নতুন ব্যবহারকারী- সবার চাহিদাই পূরণ করে। তাদের উল্লেখযোগ্য পণ্যগুলো হলো:

•    ট্যুরবক্স নিও (TourBox Neo): এটি তাদের দ্বিতীয় প্রজন্মের এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় তারযুক্ত মডেল। প্রথম সংস্করণের কিছু ত্রুটি দূর করে এর নব ও চাকাকে আরও মসৃণ এবং নিখুঁত করা হয়েছিল। যাঁরা নির্দিষ্ট ডেস্কে বসে কাজ করেন, তাঁদের জন্য এটি একটি আদর্শ ও টেকসই যন্ত্র।

•    ট্যুরবক্স এলিট (TourBox Elite): এটি ট্যুরবক্সের প্রিমিয়াম বা শীর্ষ মডেল। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি ডুয়াল-চ্যানেল ব্লুটুথের মাধ্যমে তার ছাড়াই যুক্ত করা যায়। পাশাপাশি এতে রয়েছে ‘হ্যাপটিক ফিডব্যাক’ (স্পর্শের অনুভূতি), অর্থাৎ নব ঘোরালে ব্যবহারকারী আঙুলে হালকা কাঁপুনি অনুভব করবেন, যা কাজের সময় সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এটি উইন্ডোজ ও ম্যাকের পাশাপাশি ট্যাবলেটেও ব্যবহার করা যায়।

•    ট্যুরবক্স এলিট প্লাস (TourBox Elite Plus) মূলত আইপ্যাড ও অ্যান্ড্রয়েড ট্যাবলেট ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে তৈরি তাদের সর্বাধুনিক ফ্ল্যাগশিপ মডেল। এতে রয়েছে অনবোর্ড প্রিসেট মেমোরি, ডুয়াল-চ্যানেল ব্লুটুথ ৫.০ এবং উন্নত হ্যাপটিক ফিডব্যাক, যার ফলে পিসির বাইরে ট্যাবলেটেও প্রোক্রিয়েট বা লাইটরুমের মতো অ্যাপে নিখুঁত ও স্বচ্ছন্দ নিয়ন্ত্রণের অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়।

•    ট্যুরবক্স লাইট (TourBox Lite): সম্প্রতি বাজারে আসা এই মডেলটি মূলত নতুন ব্যবহারকারী বা যাঁদের বাজেট কিছুটা কম, তাঁদের কথা ভেবে তৈরি। এতে বাটনের সংখ্যা কিছুটা কমিয়ে নকশাকে আরও সরল করা হয়েছে, তবে মূল কাজের অভিজ্ঞতা প্রায় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

•    ট্যুরবক্স কনসোল (TourBox Console) সফটওয়্যার: এটি কোনো হার্ডওয়্যার নয়, বরং ট্যুরবক্সের মস্তিষ্ক। এটি তাদের নিজস্ব সফটওয়্যার, যা দিয়ে ব্যবহারকারীরা যন্ত্রটির বাটন ও নবগুলো কাস্টোমাইজ করেন। শত শত প্রি-সেট ও ম্যাক্রো তৈরির সুবিধা এই সফটওয়্যারেই রয়েছে।



কন্ট্রোলারের মূল বৈশিষ্ট্য
কিবোর্ডের মতো গতানুগতিক অসংখ্য বাটনের বদলে এতে রয়েছে হাতের গড়ন অনুযায়ী বসানো বিভিন্ন আকারের বাটন, চাকা (হুইল) ও নব। সৃজনশীল কাজকে আরও সহজ ও আনন্দদায়ক করাই ছোট এই যন্ত্রটির মূল লক্ষ্য।

হাতের মুঠোয় সব শর্টকাট
ট্যুরবক্স কন্ট্রোলারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর কাস্টোমাইজেশন বা নিজের মতো সাজিয়ে নেওয়ার সুযোগ। কিবোর্ডে যেমন নির্দিষ্ট কাজের জন্য নির্দিষ্ট বাটন খুঁজতে হয়, এখানে সে ঝামেলা নেই। ধরুন, ফটোশপে কাজ করার সময় ব্রাশের আকার বারবার বদলাতে হচ্ছে। কিবোর্ডের শর্টকাট না চেপে কেবল ট্যুরবক্সের একটি নব ঘুরিয়েই সেকেন্ডের ভগ্নাংশে কাজটি করা সম্ভব।

একইভাবে ক্যানভাস ঘোরানো, জুম ইন-আউট করা বা নির্দিষ্ট টুল নির্বাচনের মতো কাজগুলো নিজের সুবিধামতো বোতামে ঠিক করে নেওয়া যায়। যে কাজ দিনে শতবার করতে হয়, সেটি একটি নব বা চাকার মাধ্যমে করতে পারলে হাতের অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া অনেকাংশে কমে যায়।

আলোকচিত্রী ও ভিডিও এডিটরদের জন্য আশীর্বাদ
আলোকচিত্রীদের জন্য ট্যুরবক্স যেন জাদুর কাঠির মতো কাজ করে। অ্যাডোবি লাইটরুমে ছবি সম্পাদনার সময় এক্সপোজার, কনট্রাস্ট, হাইলাইট বা স্যাচুরেশনের মতো মানগুলো মাউস দিয়ে টেনে পরিবর্তন করা বেশ সময়সাপেক্ষ। ট্যুরবক্সে এসব কাজ বিভিন্ন নব ও চাকার সঙ্গে যুক্ত করে নেওয়া যায়। ফলে শত শত ছবি সম্পাদনার কাজ হয়ে ওঠে দ্রুত ও সাবলীল।

ভিডিও সম্পাদনার ক্ষেত্রেও এর জুড়ি মেলা ভার। প্রিমিয়ার প্রো, দ্যাভিঞ্চি রিজলভ বা ফাইনাল কাট প্রোর মতো সফটওয়্যারগুলোতে টাইমলাইনে বারবার সামনে-পেছনে যাওয়া বা ক্লিপ কাটার মতো কাজগুলো ট্যুরবক্সের চাকায় যুক্ত করে নিলে মাউসের ওপর নির্ভরতা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। হাতের কাছেই সব নিয়ন্ত্রণ থাকায় দীর্ঘ সময়ের ভিডিও সম্পাদনায় কাজের গতি বাড়ে বহুগুণ।



এক বাটনের অনেক কাজ: ম্যাক্রোর জাদু
সাধারণ শর্টকাট কি-প্যাডের চেয়ে ট্যুরবক্সকে আলাদা করেছে এর ‘ম্যাক্রো’ সুবিধা। অনেক সময় একটি কাজ সম্পন্ন করতে পরপর কয়েকটি কমান্ড দেওয়ার প্রয়োজন হয়। ট্যুরবক্সে এই কমান্ডগুলোকে একটি ম্যাক্রোর অধীনে এনে একটিমাত্র বাটনে যুক্ত করা যায়। ফলে বারবার ভিন্ন ভিন্ন বাটন না চেপে একটি বাটন চাপলেই ধারাবাহিকভাবে কাজগুলো নিজ থেকেই সম্পন্ন হয়। নিয়মিত একই প্রক্রিয়ায় কাজ করা ব্যবহারকারীদের জন্য এটি মহামূল্যবান সময় বাঁচায়।

সফটওয়্যার বদলালে প্রিসেটও বদলায়
এর আরেকটি চমৎকার দিক হলো ভিন্ন ভিন্ন সফটওয়্যারের জন্য আলাদা নিয়ন্ত্রণ (প্রিসেট) তৈরির সুবিধা। ফটোশপের জন্য আপনি যে বাটন বিন্যাস তৈরি করেছেন, ভিডিও সম্পাদনার সফটওয়্যারে গেলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই সফটওয়্যারের বিন্যাসে বদলে যাবে। একই যন্ত্র দিয়ে কোনো বাধা ছাড়াই ছবি সম্পাদনা, ভিডিও সম্পাদনা বা গ্রাফিক্সের কাজ করা যায়। ব্যবহারকারী চাইলে নিজের পছন্দমতো অগণিত প্রিসেট তৈরি করে সংরক্ষণ করতে পারেন।

ডেস্কটপের গণ্ডি পেরিয়ে ট্যাবলেটেও
কেবল ডেস্কটপ বা ল্যাপটপ নয়, ট্যুরবক্সের নতুন প্রজন্মের মডেলগুলোতে (যেমন: এলিট বা এলিট প্লাস) ব্লুটুথের মাধ্যমে আইপ্যাড বা অ্যান্ড্রয়েড ট্যাবলেটের সঙ্গে যুক্ত করার সুবিধা রয়েছে। যাঁরা ট্যাবলেটে ‘প্রোক্রিয়েট’ বা ‘ক্লিপ স্টুডিও পেইন্ট’-এর মতো সফটওয়্যারে ছবি আঁকেন বা নকশা করেন, তাঁদের জন্য এটি দারুণ এক সংযোজন। ডেস্কে বসে কাজ করার যে স্বাচ্ছন্দ্য, সেটি এখন ট্যাবলেট হাতে নিয়েও পাওয়া সম্ভব।

সবার জন্য কি প্রয়োজন?
এত সব সুবিধা থাকলেও ট্যুরবক্স সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য অপরিহার্য কোনো যন্ত্র নয়। যাঁরা শখের বশে মাঝেমধ্যে দু-একটি ছবি বা ভিডিও সম্পাদনা করেন, তাঁদের জন্য গতানুগতিক কিবোর্ড-মাউসই যথেষ্ট। কিন্তু যাঁরা পেশাদার, যাঁদের দিনের ঘণ্টার পর ঘণ্টা এসব কাজে ব্যয় হয়, তাঁদের জন্য এটি একটি দারুণ বিনিয়োগ।

তবে মনে রাখতে হবে, ট্যুরবক্স হাতে পেলেই রাতারাতি কাজের গতি বাড়বে না। যন্ত্রটির সঙ্গে মানিয়ে নিতে এবং মাসল মেমোরি (পেশির স্মৃতি) তৈরি করতে কিছুটা সময় লাগে। একবার কোন বাটনে কী কাজ, তা মুখস্থ হয়ে গেলে কিবোর্ডের দিকে না তাকিয়েই জাদুর মতো কাজ করা সম্ভব।

কাজের ধরন নয়, বদলায় অভিজ্ঞতা
পরিশেষে বলা যায়, ট্যুরবক্স কাজের মূল ধরনকে বদলে দেয় না, বরং কাজ করার অভিজ্ঞতাকে বদলে দেয়। এটি কিবোর্ড বা মাউসের সম্পূর্ণ বিকল্প নয়, বরং তাদের যোগ্য পরিপূরক। সৃজনশীল কাজের জগতে যেখানে প্রতিটি সেকেন্ড এবং কাজের মনোযোগ অত্যন্ত মূল্যবান, সেখানে কিবোর্ড-মাউসের পরিচিত জগতের বাইরে গিয়ে ট্যুরবক্সের মতো একটি উদ্ভাবনী যন্ত্র প্রতিদিনের পরিশ্রমে এনে দিতে পারে অভাবনীয় স্বস্তি।


কোথায় পাবেন?
বাংলাদেশের বাজারে ট্যুরবক্সের সকল পণ্য পেতে আপনার পাশে রয়েছে ক্রিয়েটিভ ও অডিও পণ্যের নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান মাল্টিমিডিয়া কিংডম। বাংলাদেশের বাজারে আমরা শুধু একটি দোকান নই, ২৬ বছরের একটি ট্রাস্টেড প্রতিষ্ঠান। আমরা বিশ্বাস করি, একটি প্রিমিয়াম প্রযুক্তিপণ্য কেনা বড় একটি বিনিয়োগ। তাই মাল্টিমিডিয়া কিংডমে আমরা কেবল পণ্য বিক্রির চেয়ে আগ্রহী ক্রেতাদের সুপরামর্শ দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আপনার কাজের ধরন অনুযায়ী কোন পণ্যটি সেরা হবে, তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগলে সরাসরি আমাদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এর সঙ্গে (  01755532345  ) পরামর্শ করার সুযোগ রয়েছে। কেনার আগে আপনার প্রয়োজন বুঝে সঠিক পণ্যটি বেছে নিতে আমরা আপনাকে একজন বিশেষজ্ঞের মতোই গাইড করব।