ই-বুক পাঠকের বাজারে গত কয়েক বছরে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে এমন ডিভাইসগুলোর মাধ্যমে, যেগুলো শুধু বই পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নোট নেওয়া, বিভিন্ন ফরম্যাটের বই পড়া, এমনকি প্রয়োজন হলে হালকা অ্যাপ ব্যবহারের সুযোগও যোগ হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় চীনের ওনিক্স বুক্সের নতুন ই-রিডার বুক্স গো ৬ জেন ২ (Boox Go 6 Gen 2) এমন একটি ডিভাইস, যা মূলত বইপড়ুয়াদের কথা মাথায় রেখেই তৈরি করা হয়েছে। ছোট, হালকা, বহনযোগ্য এই ই-রিডারটি কেবল কাগজের বইয়ের অনুভূতিই দেয় না, বরং অ্যান্ড্রয়েডভিত্তিক উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম হওয়ায় ব্যবহারকারীদের জন্য তৈরি করেছে আরও বিস্তৃত সম্ভাবনা।

প্রথম ঝলক
বুক্স গো ৬ জেন ২ একটি দারুন ফিনিশিং এবং সহজে পকেটে বহন করার উপযোগী অ্যান্ড্রয়েড ই-রিডার। এর মূল শক্তি লুকিয়ে আছে সফটওয়্যারের স্বাধীনতায়। এতে রয়েছে ওয়ার্ম ও ডুয়াল টোনের ফ্রন্ট লাইট, গুগল প্লে স্টোরের উন্মুক্ত সুবিধা এবং একটি দুর্দান্ত বিল্ট-ইন রিডিং অ্যাপ- যা পাঠকদেরর প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে যাবে। যারা বিভিন্ন ফরম্যাটের বই এবং ডিজিটাল স্বত্ব বা ডিআরএম নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় করে পড়েন, তাদের জন্য এই একটি ছোট যন্ত্র সবকিছুর সমাধান হতে পারে।

আনবক্সিং এবং প্যাকেজে যা যা থাকছে
বাংলাদেশে বুক্সের অথোরাইজড ডিস্ট্রিবিউটর মাল্টিমিডিয়া কিংডম থেকে বুক্স গো ৬ জেন ২ কিনলে অফিশিয়াল প্যাকেজের সবই পাবেন। ভেতরে পাবেন- বুক্স গো ৬ জেন ২ রিডার, একটি ইউএসবি-সি কেবল, কার্ড ট্রে বের করার পিন, কুইক স্টার্ট গাইড ও ওয়ারেন্টি কার্ড। 



ডিভাইসটির ওজন মাত্র ১৬০ গ্রাম এবং এর পরিমাপ ১৪৯ x ১০৯ x ৬.৮ মিলিমিটার। এটি এতটাই ছোট ও হালকা যে একহাতে ধরে দীর্ঘক্ষণ অনায়াসে পড়া যায়, যা কিন্ডল পেপারহোয়াইটের থেকে অনেক হালকা।  ডিভাইসটির পেছনের টেক্সচারযুক্ত আবরণ হাতে ভালো গ্রিপ দেয়। ফলে সহজে পিছলে যাওয়ার আশঙ্কা কম। সামগ্রিকভাবে এটি মধ্যম দামের ই-রিডার হলেও একটি প্রিমিয়াম অনুভূতি দেয়।

রঙের বৈচিত্র্য ও বাটন
মাল্টিমিডিয়া কিংডম-থেকে বুক্স গো ৬ জেন ২ এর চারটি কালার ভেরিয়েন্ট তথা প্লাম, স্টোন, শেল এবং কাস্টার্ড- এই চারটি রঙের ডিভাইসই কিনতে পারবেন। প্লাম ভেরিয়েন্টে কালো রঙের ফ্রেম এবং বাকিগুলোতে সাদা ফ্রেম থাকছে। ডিভাইসটির বডির উপরের দিকে একটি মাত্র ফিজিক্যাল পাওয়ার বাটন রয়েছে।

দৈনন্দিন ব্যবহারে ফ্রন্ট লাইটের অভিজ্ঞতা
এই রিডারটি কেনার অন্যতম বড় কারণ হতে পারে এর দ্বৈত বা ডুয়াল টোনের ফ্রন্ট লাইট। যারা চোখের শান্তির জন্য সত্যিকারের ওয়ার্ম বা উষ্ণ আলোর সুবিধা চান তাদের জন্য এটি আদর্শ হতে পারে। এর ঠান্ডা ও উষ্ণ, দুই ধরনের আলোর রঙ আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, যা ব্যবহারকারীকে কার্যকর সুবিধা দেবে।

ডিসপ্লে : কাগজের বইয়ের মতো অভিজ্ঞতা
এই ই-রিডারের সবচেয়ে বড় শক্তি এর ৬ ইঞ্চির ই-ইঙ্ক কার্টা ১৩০০ ডিসপ্লে। আগের প্রজন্মের তুলনায় নতুন ডিসপ্লেতে কনট্রাস্ট আরও উন্নত হয়েছে। অক্ষরগুলো আরও স্পষ্ট ও তীক্ষ্ণ দেখায়। ৩০০ পিপিআই রেজোলিউশনের কারণে বাংলা, ইংরেজি কিংবা অন্যান্য ভাষার ছোট ফন্টও পরিস্কারভাবে দেখা যায়। যারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বই পড়েন, তাঁদের জন্য এটি বিশেষ সুবিধাজনক।

ডিসপ্লেটি সূর্যের আলোতেও সহজে পড়া যায়। সাধারণ ট্যাবলেট বা স্মার্টফোনের মতো আলো প্রতিফলনের সমস্যা নেই। ফলে পার্কে, বারান্দায় কিংবা ভ্রমণের সময়ও আরামে বই পড়া সম্ভব।

সফটওয়্যার: অ্যান্ড্রয়েডের সুবিধা
অ্যান্ড্রয়েড ১১ অপারেটিং সিস্টেম এবং পূর্ণ গুগল প্লে স্টোরের সুবিধা থাকাটাই একে অন্যান্য ই-রিডার থেকে এগিয়ে রাখবে। এই ডিভাইসে যেকোনো রিডিং অ্যাপ ইনস্টল করা যায়। অ্যামাজন থেকে কেনা বইয়ের জন্য কিন্ডল অ্যাপ, সাইডলোড করা ফাইলের জন্য অন্যান্য অ্যাপ, কোবো, লিবিবি, পিডিএফ রিডার কিংবা বিভিন্ন ওপেন-সোর্স রিডিং অ্যাপ এবং যেসব বইয়ের ডিআরএম (DRM) অন্য ডিভাইসে চলে না, সেগুলোর জন্য সহজেই থার্ড-পার্টি রিডার ব্যবহার করা যায়। ফলে যাঁদের পছন্দের বই বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে আছে, তাঁদের জন্য এটি বড় সুবিধা।



প্রায় সব ধরনের বইয়ের ফরম্যাট সমর্থন
বক্সের নিজস্ব নিওরিডার সফটওয়্যারটি ই-রিডারের অন্যতম শক্তিশালী অংশ। ডিভাইসটিতে ইপাব, ইপাব৩, পিডিএফ, মোবি, এজেডডব্লিউ৩, টিএক্সটি, ডিওসিএক্স, এইচটিএমএল, সিবিজেড, সিবিআরসহ অসংখ্য ফরম্যাট সমর্থন করে।

ছবি দেখার জন্য পিএনজি, জেপিজি এবং অডিওর জন্য এমপি৩ ফরম্যাটও সমর্থন (সাপোর্ট) করে। এর আসল সুবিধা পাওয়া যায় লাইব্রেরির বই পড়ার ক্ষেত্রে। এলসিপি সুরক্ষাযুক্ত লাইব্রেরির বইগুলো এফবিরিডার অ্যাপ দিয়ে অনায়াসে পড়া যায়। 

এছাড়া গবেষণাপত্র বা বড় আকারের পিডিএফ পড়ার সময় ডিভাইসটির বিভিন্ন জুম মোড, রিফ্লো, মার্জিন ক্রপিং এবং স্ক্রলিং সুবিধা বেশ কাজে আসে।

নোট-টেকিং
এটাই Boox Go 6 (Gen II)-এর সবচেয়ে বড় আপগ্রেড। প্রথম প্রজন্মের মতো শুধু পড়ার ডিভাইস নয়, এটি এখন একটা নোট-টেকিং ডিভাইসও। নতুন InkSense Plus স্টাইলাসের সঙ্গে এটি কাজ করে। ৪০৯৬ লেভেলের প্রেসার সেন্সিটিভিটি থাকায় হাতের লেখার অনুভূতি অনেকটাই কাগজে লেখার মতো। তবে এই স্টাইলাসটি আলাদা কিনতে হবে। যারা ডিভাইসটি দিয়ে বইয়ের পাশাপাশি দ্রুত নোট নিতে, আইডিয়া স্কেচ করতে বা ডকুমেন্টে অ্যানোটেশন করতে চান, তাদের জন্য এই ফিচারটি অপরিসীম সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে।




আগের চেয়ে উন্নত পারফরমেন্স
ডিভাইসটিতে আধুনিক আট-কোর প্রসেসর এবং পর্যাপ্ত র‍্যাম ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে আগের প্রজন্মের তুলনায় অ্যাপ চালু করা, বই পরিবর্তন কিংবা পৃষ্ঠা উল্টানোর গতি আরও উন্নত হয়েছে।

এর ক্যালেন্ডার এবং মেমো অ্যাপটি বেশ উন্নত করা হয়েছে। এতে গুগল ক্যালেন্ডার সিঙ্ক করার সুবিধাও রয়েছে।

ব্যাটারি-সপ্তাহের পর সপ্তাহ
ই-ইঙ্ক প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধাই হচ্ছে দীর্ঘ ব্যাটারি ব্যাকআপ। বুক্স গো ৬ জেন ২-তে রয়েছে ১৫০০ মিলিঅ্যাম্পিয়ারের ব্যাটারি। প্রতিদিন এক থেকে দুই ঘণ্টা বই পড়লে একবার চার্জে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত ব্যবহার করা সম্ভব। অবশ্য ওয়াই-ফাই চালু রাখা, নিয়মিত অ্যাপ ব্যবহার করা কিংবা আলো বেশি ব্যবহার করলে ব্যাটারি কিছুটা দ্রুত শেষ হতে পারে। তবুও সাধারণ ট্যাবলেটের তুলনায় ব্যাটারির পারফরম্যান্স কয়েক গুণ ভালো।

কানেক্টিভিটি
সংযোগের জন্য এতে রয়েছে ডুয়াল-ব্যান্ড ওয়াইফাই এবং ব্লুটুথ ৫.০, যার ফলে তারহীন হেডফোন দিয়ে অডিওবুক কিংবা পডকাস্ট শোনা সম্ভব। বিল্ট-ইন স্পিকারের পাশাপাশি এতে একটি মাইক্রোফোনও আছে। এছাড়া ডিভাইসটির সঙ্গে Boox Tappy নামের একটি রিমোট কন্ট্রোলার ব্যবহার করা যায়, যার মাধ্যমে হাত না ঘুরিয়েই পৃষ্ঠা বদলানো যায়।

ডিভাইসটিতে রয়েছে ইউএসবি টাইস-সি পোর্ট, যেটি চার্জের পাশাপাশি ওটিজি কিংবা অডিও জ্যাক পোর্ট হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে। 

মেমোরি
ডিভাইসটিতে ৩ জিবি র‍্যাম ও ৩২ জিবি অভ্যন্তরীণ স্টোরেজ রয়েছে, যা হাজার হাজার ই-বুক সংরক্ষণের জন্য যথেষ্ট। এ ছাড়া মাইক্রোএসডি কার্ড ব্যবহারের সুযোগ থাকায় বিশাল ব্যক্তিগত লাইব্রেরিও সহজে বহন করা সম্ভব।

একনজরে বুক্স গো ৬ জেন ২

  • ১৬০ গ্রাম ওজনের এই রিডারটি একহাতে ধরে পড়ার জন্য অন্য সব বড় রিডারের চেয়ে অনেক এগিয়ে।
  • কিন্ডলের অগোছালো অটো-ব্রাইটনেসের চেয়ে এর ম্যানুয়াল ফ্রন্ট লাইট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনেক বেশি বাস্তবসম্মত ও নির্ভরযোগ্য।
  • ছোট স্ক্রিনে কিন্ডল অ্যাপের ফন্ট সাইজের সমস্যার কারণে এর বিল্ট-ইন ‘নিওরিডার’ অ্যাপটিই দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য সেরা।
  • উন্মুক্ত অ্যান্ড্রয়েডের কারণে এমন সব ডিআরএম ও ফরম্যাট এতে চালানো যায় যা কিন্ডল বা কোবো রিডারে চিন্তাই করা যায় না।
  • মাইক্রোএসডি কার্ড ব্যবহারের সুযোগ থাকায় অনেক বই সংরক্ষণের সুযোগ থাকছে।

কাদের জন্য এই ডিভাইসটি উপযুক্ত?
আমি এই ডিভাইসটি তাদেরই কেনার পরামর্শ দেব, যারা একাধিক উৎস থেকে বই সংগ্রহ করে পড়েন- যেমন সাইডলোড করা ইপাব ফাইল, অ্যামাজনের কিন্ডল বই এবং লাইব্রেরি থেকে ধার নেওয়া এলসিপি সুরক্ষাযুক্ত বই। এত ছোট এবং পকেটে নেওয়ার মতো সাইজে এমন চমৎকার ফ্রন্ট লাইটের সুবিধা সাধারণত কিন্ডল পেপারহোয়াইট বা পকেটবুক ভার্স প্রো দিতে পারবে না।

কেনার আগে
বাংলাদেশে বুক্সের অথোরাইজড ডিস্ট্রিবিউটর মাল্টিমিডিয়া কিংডম। আমরাই সর্বপ্রথম দেশে বুক্সের ই-রিডার বাজারে এনেছি। প্রোডাক্ট কেনার পরবর্তী সার্ভিসিং কিংবা অ্যাক্সেসরিজের জন্য মাল্টিমিডিয়া কিংডম-ই নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান। তাই কেনার আগে মাল্টিমিডিয়া কিংডমের ওয়েবসাইট কিংবা ফিজিক্যাল স্টোর ঘুরে আসুন। প্রয়োজনীয় পরামর্শের জন্যও সার্বক্ষণিকভাবে আমরা আপনার পাশেই আছি। তাই দেরি না করে, যোগাযোগ করতে পারেন আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারেও