আঁকার পাতায় সমতল কাগজকে হঠাৎ করে জীবন্ত ও ত্রিমাত্রিক করে তোলার মূল চাবিকাঠি হলো পার্সপেক্টিভ বা পরিপ্রেক্ষিত। মাল্টিমিডিয়া কিংডমের শিল্পপ্রেমী পাঠকদের জন্য আয়োজিত এই ধারাবাহিকের আগের পর্বগুলোতে আমরা লাইন ড্রয়িং এবং মানবদেহের নিখুঁত অনুপাত নিয়ে আলোচনা করেছি। আজকের পর্বে আমরা শিখব কীভাবে দ্বিমাত্রিক কাগজের বুকে গভীরতা ও দূরত্বের বিভ্রম তৈরি করা যায় এবং ফিগার ড্রয়িংয়ের অন্যতম কঠিন কিন্তু দৃষ্টিনন্দন কৌশল 'ফোরশর্টনিং' কীভাবে সহজে রপ্ত করা সম্ভব।

পার্সপেক্টিভ বা পরিপ্রেক্ষিতের মৌলিক ধারণা
আমাদের দৃষ্টিসীমা এক অদ্ভুত নিয়মে কাজ করে। বহু দূরের একটি বিশাল দালান বা বিশাল গাছকেও আমাদের কাছে ছোট্ট মনে হয়, আবার কাছের একটি ছোট বস্তুকেও মনে হয় অনেক বড়। এই দৃশ্যমান বস্তুর আকার ও দূরত্বের গাণিতিক সম্পর্কই হলো পার্সপেক্টিভ। 

ক্যানভাসে এই দৃষ্টিভঙ্গি ফুটিয়ে তোলার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো 'হরাইজন লাইন' বা দিগন্তরেখা এবং 'ভ্যানিশিং পয়েন্ট' বা বিলীন বিন্দু। দিগন্তরেখা হলো শিল্পীর চোখের সমান্তরাল একটি কাল্পনিক রেখা। আর ভ্যানিশিং পয়েন্ট হলো কাগজের সেই বিন্দু, যেখানে গিয়ে সমস্ত সমান্তরাল রেখা মিলিয়ে যায়। রেললাইনের পাতের দিকে তাকালে যেমন মনে হয় দূর গিয়ে দুটি পাত এক বিন্দুতে মিশে গেছে, ঠিক এই কৌশলটিই ছবিতে দূরত্বের অনুভূতি তৈরি করে।

এক, দুই ও তিন বিন্দুর পার্সপেক্টিভ
ফিগার ও ব্যাকগ্রাউন্ড আঁকার সময় প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের পার্সপেক্টিভ ব্যবহার করা হয়। যখন আমরা কোনো বস্তুর ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে থাকি, তখন এক-বিন্দু বা ওয়ান-পয়েন্ট পার্সপেক্টিভ ব্যবহৃত হয়, যেখানে একটিমাত্র বিলীন বিন্দু থাকে। ঘরের ভেতরের দৃশ্য বা লম্বা করিডোর আঁকার জন্য এটি বেশ জনপ্রিয়। 

কোনো ভবনের কোণ বা বাঁক থেকে দেখলে তৈরি হয় দুই-বিন্দু বা টু-পয়েন্ট পার্সপেক্টিভ, যেখানে দিগন্তরেখায় দুটি বিলীন বিন্দু থাকে। অন্যদিকে, উঁচুতলা ভবন থেকে নিচের দিকে তাকালে কিংবা নিচ থেকে ওপরের বিশাল আকাশচুম্বী দালানের দিকে তাকালে তিন-বিন্দু বা থ্রি-পয়েন্ট পার্সপেক্টিভ তৈরি হয়। ড্রয়িংয়ে বাস্তবসম্মত মাত্রা যোগ করতে এই পার্সপেক্টিভের সঠিক প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি।

ফিগার ড্রয়িংয়ে ফোরশর্টনিংয়ের জাদু
ফিগার ড্রয়িং করার সময় কেবল দালানকোঠা বা রাস্তাঘাটেই পার্সপেক্টিভ সীমাবদ্ধ থাকে না, তা মানবদেহের ওপরও সমানভাবে প্রযোজ্য। যখন মানবদেহের কোনো অংশ সরাসরি দর্শকের চোখের দিকে প্রসারিত হয় বা পেছনের দিকে হেলে থাকে, তখন দৃশ্যানুভূতির কারণে সেই অংশটিকে স্বাভাবিকের চেয়ে খাটো বা ভিন্ন আকারের মনে হয়। শিল্পের ভাষায় এই দৃষ্টিবিভ্রমকে বলা হয় 'ফোরশর্টনিং'। উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যক্তি যদি আপনার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়, তবে তার হাতের পাতাটি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বড় দেখাবে এবং কনুই থেকে কাঁধ পর্যন্ত অংশটি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক খাটো মনে হবে। ফোরশর্টনিং না বুঝে যদি কেউ স্বাভাবিক অনুপাতে হাতটি আঁকে, তবে ছবিটি কৃত্রিম ও ভুল মনে হবে।

ফোরশর্টনিং অনুশীলনের সহজ কৌশল
ফোরশর্টনিং সহজে আয়ত্ত করার জন্য কিছু নির্দিষ্ট কৌশল মেনে চলা দরকার। প্রথমত, মানবদেহের বিভিন্ন অংশকে কয়েকটি সিলিন্ডার বা নলাকার জ্যামিতিক কাঠামোর সঙ্গে তুলনা করতে হবে। এরপর সেই নলাকার অংশগুলোকে দর্শকের দিকে ঘুরিয়ে আঁকার চেষ্টা করতে হবে। এই সময় একটি বিন্দুর ওপর আরেকটি অংশ কীভাবে ওভারল্যাপ বা আংশিক আবৃত করছে, সেদিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। 

উদাহরণস্বরূপ, সামনের দিকে প্রসারিত হাতের ক্ষেত্রে কনুইয়ের রেখাটি বাহুর রেখাকে কিছুটা ঢেকে দেবে। লাইট অ্যান্ড শেড বা আলো-ছায়ার সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে এই ফোরশর্টনিং কৌশলকে আরও বেশি জীবন্ত ও বাস্তবসম্মত করে তোলা যায়।

পার্সপেক্টিভ ও ফোরশর্টনিং মূলত চর্চা ও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের বিষয়। শুরুতে এটি কিছুটা জটিল মনে হতে পারে, তবে পেন্সিল ও কাগজের নিয়মিত সখ্য আপনাকে এই কৌশলে দক্ষ করে তুলবে। 

মাল্টিমিডিয়া কিংডমের ব্লগে আমাদের পরবর্তী আয়োজনে আমরা আলোচনা করব মানবদেহের ভেতরের গঠন, অর্থাৎ অ্যানাটমি বা পেশি ও অস্থির প্রাথমিক ধারণা নিয়ে। তত দিন পর্যন্ত বাস্তব জীবনের নানামুখী কোণ থেকে বস্তু ও মানুষকে পর্যবেক্ষণ করে স্কেচ করার অনুশীলন অব্যাহত রাখুন।

পেন্সিল স্কেচ ও ফিগার ড্রয়িংয়ের পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস
মাল্টিমিডিয়া কিংডমের পাঠকদের সুবিধার্থে আমাদের এই ধারাবাহিকের সম্পূর্ণ সিলেবাস নিচে দেওয়া হলো:
১. পর্ব এক: বেসিক গ্রামার ও লাইন ড্রয়িং
২. পর্ব দুই: মানবদেহের নিখুঁত অনুপাত ও পরিমাপ
৩. পর্ব তিন: পার্সপেক্টিভ বা পরিপ্রেক্ষিত এবং ফোরশর্টনিং
৪. পর্ব চার: অ্যানাটমি: পেশি ও অস্থির প্রাথমিক ধারণা
৫. পর্ব পাঁচ: অঙ্গপ্রত্যঙ্গ: হাত ও পা আঁকার সহজ কৌশল
৬. পর্ব ছয়: পোর্ট্রেট বা মুখাবয়ব আঁকার নিয়মাবলি
৭. পর্ব সাত: আলো-ছায়া, শেডিং এবং টেক্সচার তৈরি
৮. পর্ব আট: পূর্ণাঙ্গ ফিগার ড্রয়িং, ড্রপারি (পোশাকের ভাঁজ) এবং কম্পোজিশন
৯. পর্ব নয়: অ্যাকশন বা গতিশীল ফিগার ড্রয়িং
১০. পর্ব দশ: নিজস্ব স্টাইল তৈরি ও শিল্পীর করণীয়

আপনার ডিজিটাল সৃজনশীলতার যাত্রার জন্য গ্রাফিক্স ট্যাবলেট খুঁজছেন। তাহলে মাল্টিমিডিয়া কিংডম হতে পারে একমাত্র ভরসার স্থল। দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি পণ্যের প্রতিষ্ঠান ‘মাল্টিমিডিয়া কিংডম’ বিশ্বের নামি-দামি প্রায় সকল ব্র্যান্ডের জেনুইন গ্রাফিক্স ট্যাবলেট ও প্রয়োজনীয় অ্যাক্সেসরিজ বিশ্বস্ততার সাথে সরবরাহ করে আসছে। কেনার আগে সঠিক দিকনির্দেশনা পেতে সরাসরি কথা বলতে পারেন (+8801755532345) মাল্টিমিডিয়া কিংডম এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জুয়েল-এর সাথে। অথবা ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট কিংবা স্টোরে।