টিপস অ্যান্ড ট্রিকস
পেন্সিল স্কেচ ও ফিগার ড্রয়িং: অ্যাকশন বা গতিশীল ফিগার ড্রয়িংয়ের কৌশল
একজন মানুষ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে তার শরীরের গঠন, অনুপাত ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু সেই মানুষটিই যখন দৌড়ায়, লাফ দেয়, ঘুরে দাঁড়ায় কিংবা কোনো কাজের জন্য শরীরকে সামনে ঝুঁকিয়ে দেয়, তখন শরীরের প্রতিটি অংশের অবস্থান মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায়। এই পরিবর্তনকে কয়েকটি রেখা ও টানের মাধ্যমে কাগজে ধরে রাখাই অ্যাকশন বা গতিশীল ফিগার ড্রয়িংয়ের মূল চ্যালেঞ্জ।
মাল্টিমিডিয়া কিংডমের শিল্পানুরাগী পাঠকদের জন্য আয়োজিত পেন্সিল স্কেচ ও ফিগার ড্রয়িং ধারাবাহিকের আগের পর্বে আমরা পূর্ণাঙ্গ ফিগার ড্রয়িং, পোশাকের ভাঁজ বা ড্রপারি এবং কম্পোজিশনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেছি। এবার সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আমরা প্রবেশ করব আরও গতিশীল একটি অধ্যায়ে।
অ্যাকশন ফিগার ড্রয়িংয়ে নিখুঁত শারীরিক গঠন আঁকার চেয়ে অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মুহূর্তটির অনুভূতি ধরে রাখা। একজন মানুষ কীভাবে দৌড়াচ্ছেন, কোথায় তাঁর শরীরের ভার, কোন দিকে গতি তৈরি হয়েছে এবং পরের মুহূর্তে শরীর কোন দিকে যেতে পারে- এসবই কয়েকটি দ্রুত রেখার মাধ্যমে বোঝাতে হয়। তাই এই ধরনের আঁকা একই সঙ্গে পর্যবেক্ষণ, অ্যানাটমি, অনুপাত ও গতির অনুশীলন।
স্থির ফিগার থেকে গতিশীল ফিগারে
স্থির ফিগার আঁকার সময় শরীরের অনুপাত ও কাঠামোকে ধাপে ধাপে নির্ধারণ করার সুযোগ থাকে। গতিশীল ফিগারে সেই সুযোগ অনেক কম। কারণ এখানে মূল বিষয় হলো ‘মুহূর্ত’। একজন দৌড়বিদের ছবি আঁকার সময় যদি প্রথমেই মুখ, চুল, আঙুল কিংবা পোশাকের বিস্তারিত নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তাহলে হয়তো শেষ পর্যন্ত একটি সুন্দর অবয়ব পাওয়া যাবে, কিন্তু দৌড়ানোর অনুভূতিটি থাকবে না। বিপরীতে কয়েকটি দ্রুত ও আত্মবিশ্বাসী রেখায় শরীরের ভঙ্গি ধরতে পারলে কম বিস্তারিত ছবিও জীবন্ত মনে হতে পারে। এই কারণেই অ্যাকশন ড্রয়িংয়ে প্রথম ধাপ হলো শরীরের সামগ্রিক গতিপ্রবাহ বোঝা।
জেসচার লাইন: গতির প্রথম ইঙ্গিত
গতিশীল ফিগার আঁকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর একটি হলো জেসচার লাইন। এটি শরীরের মূল গতিপথ বা প্রবাহকে নির্দেশ করে। সাধারণত মাথা, মেরুদণ্ড, বুক ও শ্রোণির সামগ্রিক অবস্থান বিবেচনা করে এই রেখাটি নির্ধারণ করা হয়। দৌড়ানোর সময় শরীর সামনের দিকে ঝুঁকে থাকতে পারে। লাফানোর সময় শরীরের রেখা ওপরের দিকে উঠে যেতে পারে। আবার ঘূর্ণনের সময় জেসচার লাইন বাঁক নিতে পারে। এই রেখাটি নিখুঁতভাবে আঁকার প্রয়োজন নেই। বরং খুব হালকা ও দ্রুত হাতে আঁকা একটি প্রবাহমান রেখাই যথেষ্ট। এর উদ্দেশ্য হলো পুরো ফিগারকে একটি নির্দিষ্ট গতির মধ্যে রাখা।
একজন শিক্ষার্থী চাইলে প্রতিদিন কয়েক মিনিট শুধু জেসচার লাইন অনুশীলন করতে পারেন। কোনো মানুষের ছবি দেখে ৩০ সেকেন্ড, এক মিনিট বা দুই মিনিটের মধ্যে শরীরের ভঙ্গি ধরার চেষ্টা করলে পর্যবেক্ষণক্ষমতা দ্রুত বাড়ে।
গতি বোঝাতে অতিরিক্ত রেখার ব্যবহার
শুধু শরীরের বাইরের রেখা দিয়ে সব সময় গতি বোঝানো সম্ভব হয় না। তাই অ্যাকশন ড্রয়িংয়ে কিছু সহায়ক রেখা ব্যবহার করা যায়। এগুলো শরীরের গতির দিক, হাত-পায়ের বিস্তার কিংবা শরীরের মোচড় বোঝাতে সাহায্য করে। তবে এসব রেখা যেন মূল ফিগারকে আড়াল না করে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। একটি গতিশীল ফিগারের সৌন্দর্য অনেক সময় তার সরলতার মধ্যেই থাকে।
দৌড়ানো একজন মানুষের দুই হাত দুই দিকে ছড়িয়ে থাকতে পারে। একটি হাত সামনে এবং অন্যটি পেছনে গেলে শরীরের ভারসাম্য ও গতির অনুভূতি আরও স্পষ্ট হয়। একইভাবে বিপরীত পায়ের অবস্থান পরিবর্তনও গতির ছন্দ তৈরি করে।
ভারসাম্যই গতির ভিত্তি
গতিশীল ফিগার আঁকার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো- শরীরের ওজন কোথায়? মানুষ যখন দাঁড়িয়ে থাকে, তখন শরীরের ভার পায়ের ওপর নির্দিষ্টভাবে অবস্থান করে। কিন্তু দৌড়ানোর সময় অনেক ক্ষেত্রে একটি পা মাটি থেকে উঠে যায় এবং শরীরের ভার সাময়িকভাবে অন্য পায়ের ওপর বা সামনের দিকে সরে যায়। লাফানোর সময় আবার কোনো পা-ই মাটিতে নাও থাকতে পারে। এই পরিবর্তনটি সঠিকভাবে ধরতে না পারলে ফিগারটি ভাসমান, পড়ে যাওয়ার মতো কিংবা অস্বাভাবিক মনে হতে পারে।
তাই প্রথমে পায়ের অবস্থান এবং শরীরের ভারের দিক নির্ধারণ করা ভালো। এরপর কাঁধ, শ্রোণি ও মেরুদণ্ডের অবস্থান সেই ভারসাম্যের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে।
শরীরকে সহজ আকৃতিতে ভাবুন
গতিশীল ফিগার আঁকার সময় পুরো শরীরকে একসঙ্গে আঁকার চেষ্টা করলে কাজ কঠিন হয়ে যায়। বরং শরীরকে কয়েকটি সহজ ভলিউম হিসেবে কল্পনা করা যেতে পারে। মাথা একটি গোল বা ডিম্বাকৃতি ভলিউম, বুক একটি বড় আকৃতি, শ্রোণি আরেকটি ভলিউম এবং হাত-পা নলাকার গঠন- এভাবে ভাবলে শরীরের ঘূর্ণন ও বাঁক বোঝা সহজ হয়। বিশেষ করে দৌড়, লাফ বা খেলাধুলার ভঙ্গিতে বুক ও শ্রোণি একই দিকে থাকবে এমন কোনো কথা নেই। শরীরের ওপরের অংশ একদিকে ঘুরতে পারে, নিচের অংশ অন্যদিকে। এই বিপরীতমুখী গতিই অনেক সময় ফিগারে শক্তিশালী অ্যাকশনের অনুভূতি তৈরি করে।
‘লাইন অব অ্যাকশন’ ও শরীরের প্রবাহ
একটি গতিশীল ফিগারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো তার প্রবাহ। মাথা, মেরুদণ্ড, হাত ও পায়ের অবস্থান যেন আলাদা আলাদা অংশ না মনে হয়ে একই গতির অংশ বলে মনে হয়। এই প্রবাহ বোঝানোর জন্য ‘লাইন অব অ্যাকশন’ ধারণাটি কাজে লাগে। ধরুন, একজন মানুষ দ্রুত সামনের দিকে ছুটছেন। তাঁর মাথা সামান্য সামনে, বুক সামনে ঝুঁকে এবং এক পা পেছনে প্রসারিত। এসব আলাদা রেখা হলেও সব মিলিয়ে একটি সামগ্রিক সামনের দিকে যাওয়ার প্রবাহ তৈরি করে। এই প্রবাহ যত পরিষ্কার হবে, ছবিতে গতির অনুভূতিও তত শক্তিশালী হবে।
হাঁটা, দৌড় ও লাফ—তিন ভঙ্গির পার্থক্য
অ্যাকশন ড্রয়িং অনুশীলনের জন্য হাঁটা, দৌড়ানো ও লাফানোর ভঙ্গি খুব কার্যকর। হাঁটার সময় সাধারণত শরীরের ভার একটি পা থেকে অন্য পায়ে স্থানান্তরিত হয়। হাত ও পায়ের বিপরীতমুখী নড়াচড়া একটি স্বাভাবিক ছন্দ তৈরি করে। দৌড়ানোর সময় শরীর আরও সামনের দিকে ঝুঁকে যেতে পারে এবং হাত-পায়ের বিস্তার বাড়ে। মাটির সঙ্গে যোগাযোগের সময়ও কমে যায়। ফলে পুরো ফিগারে বেশি টান ও প্রসারণ দেখা যায়। লাফানোর সময় আবার শরীরের ভারসাম্যের ধরন সম্পূর্ণ বদলে যায়। পা শরীরের নিচে না থেকে সামনে বা পেছনে প্রসারিত হতে পারে। হাত ওপরে উঠতে পারে কিংবা শরীরকে ভারসাম্য দিতে পাশে ছড়িয়ে যেতে পারে।
এই তিন ধরনের ভঙ্গি পাশাপাশি অনুশীলন করলে শরীরের গতির পরিবর্তন বোঝা অনেক সহজ হয়।
পোশাকেও থাকতে হবে গতির ছাপ
গতিশীল ফিগারে শুধু শরীর নড়বে না, পোশাকও সেই গতির প্রতিক্রিয়া দেখাবে। একজন মানুষ দৌড়ালে তাঁর জামা শরীরের সঙ্গে পুরোপুরি লেগে থাকবে না। বাতাস ও শরীরের গতির কারণে পোশাকের কিছু অংশ পেছনে সরে যেতে পারে। এখানেই আগের পর্বে শেখা ড্রপারির ধারণা কাজে আসে।
স্থির অবস্থায় পোশাকের ভাঁজ যেভাবে নিচের দিকে ঝুলতে পারে, গতিশীল অবস্থায় সেই ভাঁজের দিক বদলে যেতে পারে। দৌড়ের সময় পেছনের কাপড় টান খেতে পারে, ঘূর্ণনের সময় এক পাশের কাপড় শরীর থেকে দূরে সরে যেতে পারে। তাই অ্যাকশন ফিগারে পোশাক আঁকার সময় শুধু শরীরের ওপর ভাঁজ বসালেই হবে না। ভঙ্গি ও গতির সঙ্গে পোশাকের প্রতিক্রিয়াও পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
হাত-পায়ের ভঙ্গিতে গতি
গতিশীল ফিগারে হাত ও পা হলো গতির অন্যতম প্রধান বাহক। দৌড়ের সময় হাতের বিপরীতমুখী নড়াচড়া, লাফের সময় পায়ের প্রসারণ কিংবা কোনো খেলোয়াড়ের শরীর ঘুরিয়ে হাত বাড়ানোর ভঙ্গি- এসবই ছবির অ্যাকশনকে স্পষ্ট করে। তবে প্রতিটি অঙ্গের বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে শুরু করা উচিত নয়। প্রথমে বাহু ও পায়ের সামগ্রিক দিক এবং দৈর্ঘ্য ঠিক করতে হবে। এরপর কনুই, হাঁটু ও কবজির অবস্থান নির্ধারণ করা যায়। বিশেষ করে হাঁটু ও কনুইয়ের বাঁক ঠিকভাবে দেখাতে পারলে ফিগারে অনেক বেশি স্বাভাবিকতা আসে।
দ্রুত স্কেচের অনুশীলন
অ্যাকশন ড্রয়িং শেখার জন্য দ্রুত স্কেচ বা ‘কুইক জেসচার’ অত্যন্ত কার্যকর। এখানে লক্ষ্য নিখুঁত ছবি আঁকা নয়; বরং অল্প সময়ে একটি ভঙ্গির মূল বৈশিষ্ট্য ধরে রাখা। শুরুতে ৩০ সেকেন্ডের স্কেচ দিয়ে অনুশীলন করা যেতে পারে। এরপর এক মিনিট, দুই মিনিট এবং পাঁচ মিনিটের স্কেচে যাওয়া যায়।
৩০ সেকেন্ডের স্কেচে শুধু জেসচার, শরীরের ভার ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের দিক ধরার চেষ্টা করুন। এক মিনিটের স্কেচে মৌলিক ভলিউম যোগ করুন। আর পাঁচ মিনিটের স্কেচে প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যানাটমি, পোশাক ও কয়েকটি ছায়া যুক্ত করতে পারেন।
এই অনুশীলনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এতে শিল্পী অপ্রয়োজনীয় বিস্তারিত বাদ দিয়ে মূল বিষয়টি দেখতে শেখেন।
ছবি দেখে নয়, গতিটা দেখুন
গতিশীল ফিগার আঁকার সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস তৈরি করতে হবে- মানুষের শরীরকে শুধু বাইরের রেখা হিসেবে না দেখা। ধরা যাক, একজন মানুষ হাত তুলে লাফ দিচ্ছেন। তাঁর শরীরের বাইরের রেখা অনেক জটিল হতে পারে। কিন্তু ভেতরের কাঠামো যদি বোঝা যায়, তাহলে কয়েকটি সরল রেখাতেই সেই ভঙ্গি প্রকাশ করা সম্ভব।
তাই ছবি দেখার সময় নিজেকে প্রশ্ন করুন- শরীরের কোন অংশে টান আছে? কোথায় সংকোচন? কোন অংশ সামনে এগিয়ে এসেছে? কোন অংশ পেছনে সরে গেছে? শরীরের ভার কোন দিকে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আসলে অ্যাকশন ড্রয়িংয়ের ভিত্তি।
অ্যানাটমি ভুলে গেলে চলবে না
গতিশীল ফিগারে দ্রুততা গুরুত্বপূর্ণ হলেও অ্যানাটমিকে উপেক্ষা করা যায় না। শরীরের পেশি, অস্থিসন্ধি ও ভলিউম সম্পর্কে ধারণা থাকলে কঠিন ভঙ্গিও সহজে আঁকা যায়। তবে অ্যাকশন ড্রয়িংয়ের সময় প্রতিটি পেশি আলাদা করে দেখানোর প্রয়োজন নেই। বরং কোন পেশি কোথায় টান তৈরি করছে এবং কোন অংশ সংকুচিত হচ্ছে, সেটি বোঝানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
একজন মানুষ হাত ভাঁজ করলে কনুইয়ের আশপাশের গঠন বদলাবে। পা ভাঁজ করলে হাঁটুর অবস্থান ও ঊরুর ভলিউম পরিবর্তিত হবে। শরীর ঘুরলে বুক ও শ্রোণির আকৃতিতেও পরিবর্তন দেখা যাবে। এই পরিবর্তনগুলো বুঝতে পারলেই অ্যানাটমি ছবির ভেতরে স্বাভাবিকভাবে কাজ করবে।
আলো-ছায়া দিয়ে গতি আরও স্পষ্ট করা
আগের পর্বে আমরা আলো-ছায়া নিয়ে আলোচনা করেছি। গতিশীল ফিগারে সেই জ্ঞান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শরীরের বিভিন্ন অংশের ভলিউম বোঝাতে ছায়া ব্যবহার করা যায়, তবে গতি যেন শেডিংয়ের কারণে হারিয়ে না যায়।
যে অংশ সামনে এগিয়ে এসেছে, সেখানে আলো তুলনামূলক স্পষ্ট হতে পারে। শরীরের ভাঁজ, এক অংশের আড়ালে থাকা অন্য অংশ কিংবা পোশাকের গভীর ভাঁজে ছায়া তৈরি হবে।
তবে প্রথমে গতি ও কাঠামো ঠিক করতে হবে, পরে শেডিং। উল্টো করলে ছবির একটি অংশ সুন্দর হলেও পুরো ফিগারের ভঙ্গি দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
অ্যাকশন লাইনের বাইরে ভাবুন
গতিশীল ফিগার মানেই হাত-পা ছড়িয়ে দেওয়া নয়। শরীরের সামান্য বাঁক, মাথার ঘূর্ণন কিংবা এক পায়ের ওপর ভর দেওয়ার মধ্যেও শক্তিশালী অ্যাকশন থাকতে পারে।
একজন মানুষ জানালার বাইরে তাকিয়ে শরীর সামান্য সামনে ঝুঁকিয়েছেন- এটিও একটি গতিশীল ভঙ্গি। একজন শিল্পী চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ানোর মুহূর্ত ধরতে পারেন। কোনো মানুষ পেছনে ফিরে তাকাচ্ছেন- সেখানেও শরীরের ওপরের ও নিচের অংশে ভিন্ন গতির সম্পর্ক তৈরি হতে পারে।
অর্থাৎ, অ্যাকশন ড্রয়িং মানে শুধু দৌড় বা লাফ নয়; বরং শরীরের ভেতরের পরিবর্তন ও মুহূর্তের অনুভূতি ধরে রাখা।
কম্পোজিশনে গতির জন্য জায়গা রাখুন
গতিশীল ফিগারের কম্পোজিশনে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ- ফিগার যে দিকে এগোচ্ছে বা তাকাচ্ছে, সেই দিকে পর্যাপ্ত জায়গা রাখা।
একজন দৌড়বিদ যদি ডান দিকে ছুটে যান, তাহলে ডান পাশে কিছুটা খোলা জায়গা রাখলে দর্শকের চোখও যেন তাঁর গতির সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারে। ফিগারের সামনে জায়গা একেবারে না থাকলে অনেক সময় মনে হতে পারে তিনি কোনো অদৃশ্য দেয়ালের দিকে ছুটছেন।
অবশ্য ইচ্ছাকৃতভাবে এই নিয়ম ভেঙেও নাটকীয় কম্পোজিশন তৈরি করা যায়। তবে নিয়মটি আগে বোঝা জরুরি।
অনুশীলনের জন্য কয়েকটি সহজ বিষয়
অ্যাকশন ড্রয়িং শেখার জন্য প্রতিদিনের জীবনই সবচেয়ে ভালো মডেল। হাঁটছেন এমন মানুষ, সিঁড়ি দিয়ে উঠছেন কেউ, খেলাধুলা করছে এমন মানুষ কিংবা কোনো কাজের সময় শরীরের ভঙ্গি- এসব পর্যবেক্ষণ করা যায়।
প্রথম দিকে ছবি আঁকার সময় বিস্তারিত নিয়ে চিন্তা না করে শুধু ভঙ্গি ধরুন। একটি কাগজে পাশাপাশি কয়েকটি ছোট জেসচার স্কেচ তৈরি করুন। প্রতিটি স্কেচে সময় কম রাখুন।
পরে যেসব ভঙ্গি সবচেয়ে আকর্ষণীয় মনে হবে, সেগুলোর একটি বেছে নিয়ে একটু বড় করে আঁকুন। তখন অ্যানাটমি, পোশাক, আলো-ছায়া ও টেক্সচার যুক্ত করুন।
এভাবে দ্রুত স্কেচ থেকে ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ ফিগারের দিকে এগোলে শেখার প্রক্রিয়াটি অনেক বেশি স্বাভাবিক হয়।
নতুনদের যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলা উচিত
অ্যাকশন ফিগার আঁকার সময় সবচেয়ে সাধারণ ভুল হলো শরীরকে খুব শক্ত করে ফেলা। গতিশীল শরীরে স্বাভাবিকভাবেই বাঁক, টান ও অসমতা থাকে। সবকিছুকে সোজা ও সমান রাখলে গতি হারিয়ে যায়।
আরেকটি ভুল হলো অঙ্গপ্রত্যঙ্গের দৈর্ঘ্য না মেনে দ্রুত আঁকা। জেসচার দ্রুত হতে পারে, কিন্তু অনুপাতের মৌলিক ধারণা ঠিক থাকা প্রয়োজন। এ ছাড়া শুধু হাত-পায়ের অবস্থান দেখে ভঙ্গি আঁকা, শরীরের ভারের দিক উপেক্ষা করা এবং পোশাককে শরীরের সঙ্গে একেবারে স্থিরভাবে আটকে দেওয়া—এসব ভুলও ছবির গতিশীলতা কমিয়ে দেয়।
সবশেষে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার- প্রতিটি রেখা সুন্দর করার চেষ্টা করলে অ্যাকশন ড্রয়িংয়ের স্বাভাবিকতা নষ্ট হতে পারে। কখনো কখনো দ্রুত, অসম্পূর্ণ একটি রেখাই গতির অনুভূতি সবচেয়ে ভালোভাবে প্রকাশ করে।
পেন্সিলের গতি, হাতের গতি
অ্যাকশন ড্রয়িংয়ের সঙ্গে শিল্পীর নিজের হাতের গতিরও একটি সম্পর্ক আছে। খুব ধীরে ও দ্বিধাগ্রস্তভাবে রেখা টানলে ছবিতে সেই দ্বিধার ছাপ পড়ে। তাই দ্রুত স্কেচের সময় হাতকে কিছুটা মুক্ত রাখতে হয়। প্রথম রেখাটি ভুল হলে থেমে না গিয়ে পরের রেখা দিয়ে কাঠামো সংশোধন করা যায়। প্রয়োজন হলে পরে অপ্রয়োজনীয় রেখা মুছে দেওয়া যাবে। শুরুতেই নিখুঁত রেখা পাওয়ার চেষ্টা না করে রেখার মাধ্যমে ভাব প্রকাশের অভ্যাস তৈরি করাই বেশি জরুরি।
গতিকে ধরাই সবচেয়ে বড় সাফল্য
অ্যাকশন বা গতিশীল ফিগার ড্রয়িং মূলত একটি মুহূর্তকে ধরে রাখার শিল্প। এখানে শরীরের অনুপাত, অ্যানাটমি, জেসচার, ভারসাম্য, পোশাক, আলো-ছায়া ও কম্পোজিশন—সবকিছু একসঙ্গে কাজ করে। একটি সফল অ্যাকশন স্কেচে হয়তো সব আঙুল নিখুঁতভাবে আঁকা থাকবে না, পোশাকের প্রতিটি ভাঁজও দেখা যাবে না। কিন্তু দর্শক ছবিটির দিকে তাকিয়ে যদি বুঝতে পারেন মানুষটি কোন দিকে যাচ্ছে, কী করছেন এবং সেই মুহূর্তে তাঁর শরীরের কী ধরনের টান তৈরি হয়েছে- তাহলেই স্কেচটি সফল।
নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে এই অনুভূতি তৈরি হয়। শুরুতে ৩০ সেকেন্ডের ছোট স্কেচ, পরে এক মিনিটের জেসচার এবং শেষ পর্যন্ত কয়েক মিনিটের বিস্তারিত ফিগার- এই ধারাবাহিক অনুশীলন হাত ও চোখের সমন্বয় বাড়াতে সাহায্য করবে।
মাল্টিমিডিয়া কিংডমের এই ধারাবাহিকের পরবর্তী পর্বে আমরা ফিগার ড্রয়িংয়ের দশম ও শেষ পর্ব ‘নিজস্ব স্টাইল তৈরি ও শিল্পীর করণীয়’ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবো। সেই পর্যন্ত গতিশীল ফিগার ড্রয়িংয়ের কৌশল আয়ত্ব করতে থাকুন।
মাল্টিমিডিয়া কিংডমের শিল্পানুরাগী পাঠকদের জন্য আয়োজিত পেন্সিল স্কেচ ও ফিগার ড্রয়িং ধারাবাহিকের আগের পর্বে আমরা পূর্ণাঙ্গ ফিগার ড্রয়িং, পোশাকের ভাঁজ বা ড্রপারি এবং কম্পোজিশনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেছি। এবার সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আমরা প্রবেশ করব আরও গতিশীল একটি অধ্যায়ে।
অ্যাকশন ফিগার ড্রয়িংয়ে নিখুঁত শারীরিক গঠন আঁকার চেয়ে অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মুহূর্তটির অনুভূতি ধরে রাখা। একজন মানুষ কীভাবে দৌড়াচ্ছেন, কোথায় তাঁর শরীরের ভার, কোন দিকে গতি তৈরি হয়েছে এবং পরের মুহূর্তে শরীর কোন দিকে যেতে পারে- এসবই কয়েকটি দ্রুত রেখার মাধ্যমে বোঝাতে হয়। তাই এই ধরনের আঁকা একই সঙ্গে পর্যবেক্ষণ, অ্যানাটমি, অনুপাত ও গতির অনুশীলন।
স্থির ফিগার থেকে গতিশীল ফিগারে
স্থির ফিগার আঁকার সময় শরীরের অনুপাত ও কাঠামোকে ধাপে ধাপে নির্ধারণ করার সুযোগ থাকে। গতিশীল ফিগারে সেই সুযোগ অনেক কম। কারণ এখানে মূল বিষয় হলো ‘মুহূর্ত’। একজন দৌড়বিদের ছবি আঁকার সময় যদি প্রথমেই মুখ, চুল, আঙুল কিংবা পোশাকের বিস্তারিত নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তাহলে হয়তো শেষ পর্যন্ত একটি সুন্দর অবয়ব পাওয়া যাবে, কিন্তু দৌড়ানোর অনুভূতিটি থাকবে না। বিপরীতে কয়েকটি দ্রুত ও আত্মবিশ্বাসী রেখায় শরীরের ভঙ্গি ধরতে পারলে কম বিস্তারিত ছবিও জীবন্ত মনে হতে পারে। এই কারণেই অ্যাকশন ড্রয়িংয়ে প্রথম ধাপ হলো শরীরের সামগ্রিক গতিপ্রবাহ বোঝা।
জেসচার লাইন: গতির প্রথম ইঙ্গিত
গতিশীল ফিগার আঁকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর একটি হলো জেসচার লাইন। এটি শরীরের মূল গতিপথ বা প্রবাহকে নির্দেশ করে। সাধারণত মাথা, মেরুদণ্ড, বুক ও শ্রোণির সামগ্রিক অবস্থান বিবেচনা করে এই রেখাটি নির্ধারণ করা হয়। দৌড়ানোর সময় শরীর সামনের দিকে ঝুঁকে থাকতে পারে। লাফানোর সময় শরীরের রেখা ওপরের দিকে উঠে যেতে পারে। আবার ঘূর্ণনের সময় জেসচার লাইন বাঁক নিতে পারে। এই রেখাটি নিখুঁতভাবে আঁকার প্রয়োজন নেই। বরং খুব হালকা ও দ্রুত হাতে আঁকা একটি প্রবাহমান রেখাই যথেষ্ট। এর উদ্দেশ্য হলো পুরো ফিগারকে একটি নির্দিষ্ট গতির মধ্যে রাখা।
একজন শিক্ষার্থী চাইলে প্রতিদিন কয়েক মিনিট শুধু জেসচার লাইন অনুশীলন করতে পারেন। কোনো মানুষের ছবি দেখে ৩০ সেকেন্ড, এক মিনিট বা দুই মিনিটের মধ্যে শরীরের ভঙ্গি ধরার চেষ্টা করলে পর্যবেক্ষণক্ষমতা দ্রুত বাড়ে।
গতি বোঝাতে অতিরিক্ত রেখার ব্যবহার
শুধু শরীরের বাইরের রেখা দিয়ে সব সময় গতি বোঝানো সম্ভব হয় না। তাই অ্যাকশন ড্রয়িংয়ে কিছু সহায়ক রেখা ব্যবহার করা যায়। এগুলো শরীরের গতির দিক, হাত-পায়ের বিস্তার কিংবা শরীরের মোচড় বোঝাতে সাহায্য করে। তবে এসব রেখা যেন মূল ফিগারকে আড়াল না করে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। একটি গতিশীল ফিগারের সৌন্দর্য অনেক সময় তার সরলতার মধ্যেই থাকে।
দৌড়ানো একজন মানুষের দুই হাত দুই দিকে ছড়িয়ে থাকতে পারে। একটি হাত সামনে এবং অন্যটি পেছনে গেলে শরীরের ভারসাম্য ও গতির অনুভূতি আরও স্পষ্ট হয়। একইভাবে বিপরীত পায়ের অবস্থান পরিবর্তনও গতির ছন্দ তৈরি করে।
ভারসাম্যই গতির ভিত্তি
গতিশীল ফিগার আঁকার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো- শরীরের ওজন কোথায়? মানুষ যখন দাঁড়িয়ে থাকে, তখন শরীরের ভার পায়ের ওপর নির্দিষ্টভাবে অবস্থান করে। কিন্তু দৌড়ানোর সময় অনেক ক্ষেত্রে একটি পা মাটি থেকে উঠে যায় এবং শরীরের ভার সাময়িকভাবে অন্য পায়ের ওপর বা সামনের দিকে সরে যায়। লাফানোর সময় আবার কোনো পা-ই মাটিতে নাও থাকতে পারে। এই পরিবর্তনটি সঠিকভাবে ধরতে না পারলে ফিগারটি ভাসমান, পড়ে যাওয়ার মতো কিংবা অস্বাভাবিক মনে হতে পারে।
তাই প্রথমে পায়ের অবস্থান এবং শরীরের ভারের দিক নির্ধারণ করা ভালো। এরপর কাঁধ, শ্রোণি ও মেরুদণ্ডের অবস্থান সেই ভারসাম্যের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে।
শরীরকে সহজ আকৃতিতে ভাবুন
গতিশীল ফিগার আঁকার সময় পুরো শরীরকে একসঙ্গে আঁকার চেষ্টা করলে কাজ কঠিন হয়ে যায়। বরং শরীরকে কয়েকটি সহজ ভলিউম হিসেবে কল্পনা করা যেতে পারে। মাথা একটি গোল বা ডিম্বাকৃতি ভলিউম, বুক একটি বড় আকৃতি, শ্রোণি আরেকটি ভলিউম এবং হাত-পা নলাকার গঠন- এভাবে ভাবলে শরীরের ঘূর্ণন ও বাঁক বোঝা সহজ হয়। বিশেষ করে দৌড়, লাফ বা খেলাধুলার ভঙ্গিতে বুক ও শ্রোণি একই দিকে থাকবে এমন কোনো কথা নেই। শরীরের ওপরের অংশ একদিকে ঘুরতে পারে, নিচের অংশ অন্যদিকে। এই বিপরীতমুখী গতিই অনেক সময় ফিগারে শক্তিশালী অ্যাকশনের অনুভূতি তৈরি করে।
‘লাইন অব অ্যাকশন’ ও শরীরের প্রবাহ
একটি গতিশীল ফিগারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো তার প্রবাহ। মাথা, মেরুদণ্ড, হাত ও পায়ের অবস্থান যেন আলাদা আলাদা অংশ না মনে হয়ে একই গতির অংশ বলে মনে হয়। এই প্রবাহ বোঝানোর জন্য ‘লাইন অব অ্যাকশন’ ধারণাটি কাজে লাগে। ধরুন, একজন মানুষ দ্রুত সামনের দিকে ছুটছেন। তাঁর মাথা সামান্য সামনে, বুক সামনে ঝুঁকে এবং এক পা পেছনে প্রসারিত। এসব আলাদা রেখা হলেও সব মিলিয়ে একটি সামগ্রিক সামনের দিকে যাওয়ার প্রবাহ তৈরি করে। এই প্রবাহ যত পরিষ্কার হবে, ছবিতে গতির অনুভূতিও তত শক্তিশালী হবে।
হাঁটা, দৌড় ও লাফ—তিন ভঙ্গির পার্থক্য
অ্যাকশন ড্রয়িং অনুশীলনের জন্য হাঁটা, দৌড়ানো ও লাফানোর ভঙ্গি খুব কার্যকর। হাঁটার সময় সাধারণত শরীরের ভার একটি পা থেকে অন্য পায়ে স্থানান্তরিত হয়। হাত ও পায়ের বিপরীতমুখী নড়াচড়া একটি স্বাভাবিক ছন্দ তৈরি করে। দৌড়ানোর সময় শরীর আরও সামনের দিকে ঝুঁকে যেতে পারে এবং হাত-পায়ের বিস্তার বাড়ে। মাটির সঙ্গে যোগাযোগের সময়ও কমে যায়। ফলে পুরো ফিগারে বেশি টান ও প্রসারণ দেখা যায়। লাফানোর সময় আবার শরীরের ভারসাম্যের ধরন সম্পূর্ণ বদলে যায়। পা শরীরের নিচে না থেকে সামনে বা পেছনে প্রসারিত হতে পারে। হাত ওপরে উঠতে পারে কিংবা শরীরকে ভারসাম্য দিতে পাশে ছড়িয়ে যেতে পারে।
এই তিন ধরনের ভঙ্গি পাশাপাশি অনুশীলন করলে শরীরের গতির পরিবর্তন বোঝা অনেক সহজ হয়।
পোশাকেও থাকতে হবে গতির ছাপ
গতিশীল ফিগারে শুধু শরীর নড়বে না, পোশাকও সেই গতির প্রতিক্রিয়া দেখাবে। একজন মানুষ দৌড়ালে তাঁর জামা শরীরের সঙ্গে পুরোপুরি লেগে থাকবে না। বাতাস ও শরীরের গতির কারণে পোশাকের কিছু অংশ পেছনে সরে যেতে পারে। এখানেই আগের পর্বে শেখা ড্রপারির ধারণা কাজে আসে।
স্থির অবস্থায় পোশাকের ভাঁজ যেভাবে নিচের দিকে ঝুলতে পারে, গতিশীল অবস্থায় সেই ভাঁজের দিক বদলে যেতে পারে। দৌড়ের সময় পেছনের কাপড় টান খেতে পারে, ঘূর্ণনের সময় এক পাশের কাপড় শরীর থেকে দূরে সরে যেতে পারে। তাই অ্যাকশন ফিগারে পোশাক আঁকার সময় শুধু শরীরের ওপর ভাঁজ বসালেই হবে না। ভঙ্গি ও গতির সঙ্গে পোশাকের প্রতিক্রিয়াও পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
হাত-পায়ের ভঙ্গিতে গতি
গতিশীল ফিগারে হাত ও পা হলো গতির অন্যতম প্রধান বাহক। দৌড়ের সময় হাতের বিপরীতমুখী নড়াচড়া, লাফের সময় পায়ের প্রসারণ কিংবা কোনো খেলোয়াড়ের শরীর ঘুরিয়ে হাত বাড়ানোর ভঙ্গি- এসবই ছবির অ্যাকশনকে স্পষ্ট করে। তবে প্রতিটি অঙ্গের বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে শুরু করা উচিত নয়। প্রথমে বাহু ও পায়ের সামগ্রিক দিক এবং দৈর্ঘ্য ঠিক করতে হবে। এরপর কনুই, হাঁটু ও কবজির অবস্থান নির্ধারণ করা যায়। বিশেষ করে হাঁটু ও কনুইয়ের বাঁক ঠিকভাবে দেখাতে পারলে ফিগারে অনেক বেশি স্বাভাবিকতা আসে।
দ্রুত স্কেচের অনুশীলন
অ্যাকশন ড্রয়িং শেখার জন্য দ্রুত স্কেচ বা ‘কুইক জেসচার’ অত্যন্ত কার্যকর। এখানে লক্ষ্য নিখুঁত ছবি আঁকা নয়; বরং অল্প সময়ে একটি ভঙ্গির মূল বৈশিষ্ট্য ধরে রাখা। শুরুতে ৩০ সেকেন্ডের স্কেচ দিয়ে অনুশীলন করা যেতে পারে। এরপর এক মিনিট, দুই মিনিট এবং পাঁচ মিনিটের স্কেচে যাওয়া যায়।
৩০ সেকেন্ডের স্কেচে শুধু জেসচার, শরীরের ভার ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের দিক ধরার চেষ্টা করুন। এক মিনিটের স্কেচে মৌলিক ভলিউম যোগ করুন। আর পাঁচ মিনিটের স্কেচে প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যানাটমি, পোশাক ও কয়েকটি ছায়া যুক্ত করতে পারেন।
এই অনুশীলনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এতে শিল্পী অপ্রয়োজনীয় বিস্তারিত বাদ দিয়ে মূল বিষয়টি দেখতে শেখেন।
ছবি দেখে নয়, গতিটা দেখুন
গতিশীল ফিগার আঁকার সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস তৈরি করতে হবে- মানুষের শরীরকে শুধু বাইরের রেখা হিসেবে না দেখা। ধরা যাক, একজন মানুষ হাত তুলে লাফ দিচ্ছেন। তাঁর শরীরের বাইরের রেখা অনেক জটিল হতে পারে। কিন্তু ভেতরের কাঠামো যদি বোঝা যায়, তাহলে কয়েকটি সরল রেখাতেই সেই ভঙ্গি প্রকাশ করা সম্ভব।
তাই ছবি দেখার সময় নিজেকে প্রশ্ন করুন- শরীরের কোন অংশে টান আছে? কোথায় সংকোচন? কোন অংশ সামনে এগিয়ে এসেছে? কোন অংশ পেছনে সরে গেছে? শরীরের ভার কোন দিকে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আসলে অ্যাকশন ড্রয়িংয়ের ভিত্তি।
অ্যানাটমি ভুলে গেলে চলবে না
গতিশীল ফিগারে দ্রুততা গুরুত্বপূর্ণ হলেও অ্যানাটমিকে উপেক্ষা করা যায় না। শরীরের পেশি, অস্থিসন্ধি ও ভলিউম সম্পর্কে ধারণা থাকলে কঠিন ভঙ্গিও সহজে আঁকা যায়। তবে অ্যাকশন ড্রয়িংয়ের সময় প্রতিটি পেশি আলাদা করে দেখানোর প্রয়োজন নেই। বরং কোন পেশি কোথায় টান তৈরি করছে এবং কোন অংশ সংকুচিত হচ্ছে, সেটি বোঝানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
একজন মানুষ হাত ভাঁজ করলে কনুইয়ের আশপাশের গঠন বদলাবে। পা ভাঁজ করলে হাঁটুর অবস্থান ও ঊরুর ভলিউম পরিবর্তিত হবে। শরীর ঘুরলে বুক ও শ্রোণির আকৃতিতেও পরিবর্তন দেখা যাবে। এই পরিবর্তনগুলো বুঝতে পারলেই অ্যানাটমি ছবির ভেতরে স্বাভাবিকভাবে কাজ করবে।
আলো-ছায়া দিয়ে গতি আরও স্পষ্ট করা
আগের পর্বে আমরা আলো-ছায়া নিয়ে আলোচনা করেছি। গতিশীল ফিগারে সেই জ্ঞান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শরীরের বিভিন্ন অংশের ভলিউম বোঝাতে ছায়া ব্যবহার করা যায়, তবে গতি যেন শেডিংয়ের কারণে হারিয়ে না যায়।
যে অংশ সামনে এগিয়ে এসেছে, সেখানে আলো তুলনামূলক স্পষ্ট হতে পারে। শরীরের ভাঁজ, এক অংশের আড়ালে থাকা অন্য অংশ কিংবা পোশাকের গভীর ভাঁজে ছায়া তৈরি হবে।
তবে প্রথমে গতি ও কাঠামো ঠিক করতে হবে, পরে শেডিং। উল্টো করলে ছবির একটি অংশ সুন্দর হলেও পুরো ফিগারের ভঙ্গি দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
অ্যাকশন লাইনের বাইরে ভাবুন
গতিশীল ফিগার মানেই হাত-পা ছড়িয়ে দেওয়া নয়। শরীরের সামান্য বাঁক, মাথার ঘূর্ণন কিংবা এক পায়ের ওপর ভর দেওয়ার মধ্যেও শক্তিশালী অ্যাকশন থাকতে পারে।
একজন মানুষ জানালার বাইরে তাকিয়ে শরীর সামান্য সামনে ঝুঁকিয়েছেন- এটিও একটি গতিশীল ভঙ্গি। একজন শিল্পী চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ানোর মুহূর্ত ধরতে পারেন। কোনো মানুষ পেছনে ফিরে তাকাচ্ছেন- সেখানেও শরীরের ওপরের ও নিচের অংশে ভিন্ন গতির সম্পর্ক তৈরি হতে পারে।
অর্থাৎ, অ্যাকশন ড্রয়িং মানে শুধু দৌড় বা লাফ নয়; বরং শরীরের ভেতরের পরিবর্তন ও মুহূর্তের অনুভূতি ধরে রাখা।
কম্পোজিশনে গতির জন্য জায়গা রাখুন
গতিশীল ফিগারের কম্পোজিশনে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ- ফিগার যে দিকে এগোচ্ছে বা তাকাচ্ছে, সেই দিকে পর্যাপ্ত জায়গা রাখা।
একজন দৌড়বিদ যদি ডান দিকে ছুটে যান, তাহলে ডান পাশে কিছুটা খোলা জায়গা রাখলে দর্শকের চোখও যেন তাঁর গতির সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারে। ফিগারের সামনে জায়গা একেবারে না থাকলে অনেক সময় মনে হতে পারে তিনি কোনো অদৃশ্য দেয়ালের দিকে ছুটছেন।
অবশ্য ইচ্ছাকৃতভাবে এই নিয়ম ভেঙেও নাটকীয় কম্পোজিশন তৈরি করা যায়। তবে নিয়মটি আগে বোঝা জরুরি।
অনুশীলনের জন্য কয়েকটি সহজ বিষয়
অ্যাকশন ড্রয়িং শেখার জন্য প্রতিদিনের জীবনই সবচেয়ে ভালো মডেল। হাঁটছেন এমন মানুষ, সিঁড়ি দিয়ে উঠছেন কেউ, খেলাধুলা করছে এমন মানুষ কিংবা কোনো কাজের সময় শরীরের ভঙ্গি- এসব পর্যবেক্ষণ করা যায়।
প্রথম দিকে ছবি আঁকার সময় বিস্তারিত নিয়ে চিন্তা না করে শুধু ভঙ্গি ধরুন। একটি কাগজে পাশাপাশি কয়েকটি ছোট জেসচার স্কেচ তৈরি করুন। প্রতিটি স্কেচে সময় কম রাখুন।
পরে যেসব ভঙ্গি সবচেয়ে আকর্ষণীয় মনে হবে, সেগুলোর একটি বেছে নিয়ে একটু বড় করে আঁকুন। তখন অ্যানাটমি, পোশাক, আলো-ছায়া ও টেক্সচার যুক্ত করুন।
এভাবে দ্রুত স্কেচ থেকে ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ ফিগারের দিকে এগোলে শেখার প্রক্রিয়াটি অনেক বেশি স্বাভাবিক হয়।
নতুনদের যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলা উচিত
অ্যাকশন ফিগার আঁকার সময় সবচেয়ে সাধারণ ভুল হলো শরীরকে খুব শক্ত করে ফেলা। গতিশীল শরীরে স্বাভাবিকভাবেই বাঁক, টান ও অসমতা থাকে। সবকিছুকে সোজা ও সমান রাখলে গতি হারিয়ে যায়।
আরেকটি ভুল হলো অঙ্গপ্রত্যঙ্গের দৈর্ঘ্য না মেনে দ্রুত আঁকা। জেসচার দ্রুত হতে পারে, কিন্তু অনুপাতের মৌলিক ধারণা ঠিক থাকা প্রয়োজন। এ ছাড়া শুধু হাত-পায়ের অবস্থান দেখে ভঙ্গি আঁকা, শরীরের ভারের দিক উপেক্ষা করা এবং পোশাককে শরীরের সঙ্গে একেবারে স্থিরভাবে আটকে দেওয়া—এসব ভুলও ছবির গতিশীলতা কমিয়ে দেয়।
সবশেষে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার- প্রতিটি রেখা সুন্দর করার চেষ্টা করলে অ্যাকশন ড্রয়িংয়ের স্বাভাবিকতা নষ্ট হতে পারে। কখনো কখনো দ্রুত, অসম্পূর্ণ একটি রেখাই গতির অনুভূতি সবচেয়ে ভালোভাবে প্রকাশ করে।
পেন্সিলের গতি, হাতের গতি
অ্যাকশন ড্রয়িংয়ের সঙ্গে শিল্পীর নিজের হাতের গতিরও একটি সম্পর্ক আছে। খুব ধীরে ও দ্বিধাগ্রস্তভাবে রেখা টানলে ছবিতে সেই দ্বিধার ছাপ পড়ে। তাই দ্রুত স্কেচের সময় হাতকে কিছুটা মুক্ত রাখতে হয়। প্রথম রেখাটি ভুল হলে থেমে না গিয়ে পরের রেখা দিয়ে কাঠামো সংশোধন করা যায়। প্রয়োজন হলে পরে অপ্রয়োজনীয় রেখা মুছে দেওয়া যাবে। শুরুতেই নিখুঁত রেখা পাওয়ার চেষ্টা না করে রেখার মাধ্যমে ভাব প্রকাশের অভ্যাস তৈরি করাই বেশি জরুরি।
গতিকে ধরাই সবচেয়ে বড় সাফল্য
অ্যাকশন বা গতিশীল ফিগার ড্রয়িং মূলত একটি মুহূর্তকে ধরে রাখার শিল্প। এখানে শরীরের অনুপাত, অ্যানাটমি, জেসচার, ভারসাম্য, পোশাক, আলো-ছায়া ও কম্পোজিশন—সবকিছু একসঙ্গে কাজ করে। একটি সফল অ্যাকশন স্কেচে হয়তো সব আঙুল নিখুঁতভাবে আঁকা থাকবে না, পোশাকের প্রতিটি ভাঁজও দেখা যাবে না। কিন্তু দর্শক ছবিটির দিকে তাকিয়ে যদি বুঝতে পারেন মানুষটি কোন দিকে যাচ্ছে, কী করছেন এবং সেই মুহূর্তে তাঁর শরীরের কী ধরনের টান তৈরি হয়েছে- তাহলেই স্কেচটি সফল।
নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে এই অনুভূতি তৈরি হয়। শুরুতে ৩০ সেকেন্ডের ছোট স্কেচ, পরে এক মিনিটের জেসচার এবং শেষ পর্যন্ত কয়েক মিনিটের বিস্তারিত ফিগার- এই ধারাবাহিক অনুশীলন হাত ও চোখের সমন্বয় বাড়াতে সাহায্য করবে।
মাল্টিমিডিয়া কিংডমের এই ধারাবাহিকের পরবর্তী পর্বে আমরা ফিগার ড্রয়িংয়ের দশম ও শেষ পর্ব ‘নিজস্ব স্টাইল তৈরি ও শিল্পীর করণীয়’ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবো। সেই পর্যন্ত গতিশীল ফিগার ড্রয়িংয়ের কৌশল আয়ত্ব করতে থাকুন।
পেন্সিল স্কেচ ও ফিগার ড্রয়িংয়ের পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস
মাল্টিমিডিয়া কিংডমের পাঠকদের সুবিধার্থে আমাদের এই ধারাবাহিকের সম্পূর্ণ সিলেবাস নিচে দেওয়া হলো:
১. পর্ব এক: বেসিক গ্রামার ও লাইন ড্রয়িং
২. পর্ব দুই: মানবদেহের নিখুঁত অনুপাত ও পরিমাপ
৩. পর্ব তিন: পার্সপেক্টিভ বা পরিপ্রেক্ষিত এবং ফোরশর্টনিং
৪. পর্ব চার: অ্যানাটমি: পেশি ও অস্থির প্রাথমিক ধারণা
৫. পর্ব পাঁচ: অঙ্গপ্রত্যঙ্গ: হাত ও পা আঁকার সহজ কৌশল
৬. পর্ব ছয়: পোর্ট্রেট বা মুখাবয়ব আঁকার নিয়মাবলি
৭. পর্ব সাত: আলো-ছায়া, শেডিং এবং টেক্সচার তৈরি
৮. পর্ব আট: পূর্ণাঙ্গ ফিগার ড্রয়িং, ড্রপারি (পোশাকের ভাঁজ) এবং কম্পোজিশন
৯. পর্ব নয়: অ্যাকশন বা গতিশীল ফিগার ড্রয়িং
১০. পর্ব দশ: নিজস্ব স্টাইল তৈরি ও শিল্পীর করণীয়
আপনার ডিজিটাল সৃজনশীলতার যাত্রার জন্য গ্রাফিক্স ট্যাবলেট খুঁজছেন। তাহলে মাল্টিমিডিয়া কিংডম হতে পারে একমাত্র ভরসার স্থল। দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি পণ্যের প্রতিষ্ঠান ‘মাল্টিমিডিয়া কিংডম’ বিশ্বের নামি-দামি প্রায় সকল ব্র্যান্ডের জেনুইন গ্রাফিক্স ট্যাবলেট ও প্রয়োজনীয় অ্যাক্সেসরিজ বিশ্বস্ততার সাথে সরবরাহ করে আসছে। কেনার আগে সঠিক দিকনির্দেশনা পেতে সরাসরি কথা বলতে পারেন (+8801755532345) মাল্টিমিডিয়া কিংডম এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জুয়েল-এর সাথে। অথবা ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট কিংবা স্টোরে।